ব্যক্তিগত ও সামাজিক পর্যায়ে (ঐশীদানের প্রতি) কৃতজ্ঞতা প্রকাশ
এটা সাধারণত দেখা যায় যে কারো কোনো শিশু জন্মালে কিংবা (কোনো দেশের) স্বাধীনতা অর্জিত হলে ওই উপলক্ষটি মহা জাঁকজমকের সাথে উদযাপন করা হয়। এই উদযাপন ব্যক্তিগত ও সামাজিক উভয় পর্যায়েই হয়ে থাকে। সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা ইচ্ছা করেন যে প্রিয়নবী (ﷺ)-এর মহাসম্মানিত বেলাদত তথা ধরণীতলে শুভাগমন দিবস যখন সমাগত হয়, তখন আমাদের এ উপলক্ষে অনুভূত খুশি ও সুখ যেন অন্যান্য সকল আনন্দ-ফুর্তিকে ছাপিয়ে ওঠে।
মহানবী (ﷺ)-এর বেলাদত দিবস উদযাপনের উদ্দেশে ধর্মীয় সমাবেশ ও জশনে জুলূসের আয়োজন করতে প্রত্যেকেরই অর্থব্যয় হয়, এটা স্পষ্ট। কেউ কেউ এতে আপত্তি করেন এই বলে যে, এতে কোনো ফায়দা/উপকার নেই; এ অর্থ গরিব ও দুঃস্থদের দান করলে ভালো হতো নয় কি? কিম্বা কোনো মসজিদ বা মাদ্রাসায়? আমরা এই নেতিবাচক মনোভাবের জবাব দিতে চাই এই বলে, ওপরোক্ত খাতগুলোতে সেগুলোর নিজস্ব গুরুত্বানুসারে অর্থব্যয় করা একদম সঠিক; কিন্তু আল্লাহতা’লা উম্মতের সামাজিক সুখ-শান্তির প্রতি অধিকতর অগ্রাধিকার দিয়ে এ নেতিবাচক মনোভাবকে নাকচ করে দিয়েছেন। আল্লাহতা’লা তাঁরই খাতিরে দান-সদকাহ করতে আমাদের নিষেধ করেননি বটে, তবে স্রেফ কিছু দান-সদকাহ’র খাতে এ অর্থব্যয় করা উচিত বলে কারোরই পিছটান দেয়া উচিত নয়। কেননা আল্লাহতা’লা এই ধারণাকে রদ করেছেন এই বলে, “মুসলমানদের আনন্দ প্রকাশ করা উচিত।” অতঃপর এ কথাকে আরো স্পষ্টভাবে বোঝাতে গিয়ে বলেছেন, ‘তা তাদের সমস্ত (সঞ্চিত) ধন-দৌলত অপেক্ষা শ্রেয়’। অর্থাৎ, প্রিয়নবী (ﷺ)-এর বেলাদত উপলক্ষে অর্থব্যয় করা অন্যান্য উদ্দেশ্যে অর্থ সঞ্চয়ের চেয়েও শ্রেষ্ঠতর।
৪.৫.৭ এই আয়াতে পাকে অনেক তাকিদমূলক শব্দের প্রয়োগ
মওলিদুন্নবী (ﷺ) উদযাপনের আদেশসম্বলিত আয়াতটিতে প্রাপ্ত তাকিদের সংখ্যা প্রসঙ্গে বলতে হয়, খুব কম সংখ্যক আয়াতে করীমা-ই ওরকম তাকিদের সংখ্যা নিয়ে নাযেল হয়েছে। আলোচ্য এই আয়াতটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্যে লক্ষ্য করলে আমরা তাতে দশটি তাকিদ দেখতে পাবো:
১/ ক্বুল: ‘বলুন’ শব্দটি দিয়ে আয়াতটির সূচনা করে তাকিদ দেয়া হয়েছে; এটা শ্রোতার মনোযোগ আকর্ষণের একটি মাধ্যম।
২/বি-ফাদলিল্লাহ (মানে ‘আল্লাহরই অনুগ্রহ’): প্রশ্ন ওঠে যে এই অনুগ্রহটি কী? মস্তিষ্কে এ চিন্তার উদ্রেক করে শ্রোতা উত্তর প্রত্যাশা করেন। এটা তাকিদ সৃষ্টির আরেকটি মাধ্যম।
৩/ওয়া বি-রাহমাতিহী (‘এবং তাঁরই করুণা’): এটা তৃতীয় তাকিদ যা দ্বারা করুণাটি কী মর্মে শ্রোতার মনে একটি প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে।
৪/ ’ফযল’ তথা অনুগ্রহের পরে ‘রাহমা’ (করুণা) শব্দটির উল্লেখ-ও একটি তাকিদ।
৫/ ‘ফা’ (অতঃপর) শব্দটির হেকমত: ‘বি-যালিকা’ (সেটার জন্যে) কথার আগে (’ফা’) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যা আরবী ব্যাকরণগত তাকিদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে করা হয়েছে।
৬/ ‘বি-যালিকা’ (সেটার জন্যে): ‘অনুগ্রহ’ ও ‘করুণা’ শব্দগুলোর পরে দূর নির্দেশাত্মক সর্বনামটির ব্যবহারও তাকিদের খাতিরেই করা হয়েছে।
৭/ ‘ফা’ল-এয়াফরাহূ’ বাক্যে ‘ফা’ শব্দটি (অতঃপর মুসলমানদের আনন্দ প্রকাশ করা উচিত) যুক্ত হয়েছে তাকিদের জন্যে।
৮/ ‘ফা’ল-এয়াফরাহূ’ (অতঃপর মুসলমানদের আনন্দ প্রকাশ করা উচিত) বাক্যে ‘লাম’ অক্ষরটিও তাকিদের উদ্দেশ্যে দেয়া হয়েছে।
৯/ ‘হুয়া খায়র’ (অপেক্ষা শ্রেয়): এই সর্বনাম-ও তাকিদেরই জন্যে।
১০/ ‘মিম্মা এয়াজমা’ঊন’ (তাদের সঞ্চিত ধনসম্পদ হতে): এটাও তাকিদ দেয়ার জন্যে প্রয়োগকৃত।
ওপরের এ আয়াতে করীমায় আল্লাহতা’লা দশটি তাকিদ প্রদান করেছেন, যা দ্বারা তিনি তাঁর ’ফযল’(অনুগ্রহ) ও ‘রাহমা’ (করুণা)-প্রাপ্তির প্রতি আমাদেরকে খুশি প্রকাশ করতে আদেশ করেছেন। সাধারণত কোনো ভাষণে বা বক্তব্যে এতোগুলো তাকিদ ব্যবহার করাটা ওই সাধারণ বক্তব্যের প্রতিনিধিত্ব করে না। কিন্তু যেহেতু খোদায়ী এই আদেশটি প্রিয়নবী (ﷺ)-এর সাথে সম্পর্কিত, সেহেতু এর শোভা আরো বর্ধনের উদ্দেশ্যে এতোগুলো তাকিদ প্রদান করা হয়েছে, যাতে করে কোনো অস্বীকৃতির সম্ভাবনা না থাকে। এতোগুলো তাকিদের পরে বক্তব্যের শেষে এই খুশি প্রকাশকে মুসলমানদের সঞ্চিত ধনসম্পদের চেয়েও শ্রেষ্ঠতর বলাতে এর তাৎপর্য যে কতোটুকু, সে সম্পর্কে স্পষ্ট বোঝা যায়।
এসব তাকিদের পুনরাবৃত্তির দ্বারা কী প্রভাব সৃষ্টি করা হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর বোধগম্য হবে একটি উদাহরণে: কোনো পিতা তাঁর সন্তানকে কোনো কাজ করার আদেশ দিতে চাইলে তিনি শুধু বলেন, ‘অমুক কাজটি করো।’ সন্তান বুদ্ধিমান হলে এই আদেশ-ই যথেষ্ট হবে। কিন্তু এমন পিতা পাওয়া অসাধারণ/অস্বাভাবিক নয় যিনি তাঁর সন্তানকে বলেন, ‘বৎস, আমি তোমাকে অমুক কাজটি করতে বলছি।’ ওই সন্তান যখন এ কথা শোনে, তখন-ই সে বুঝতে পারে যে তার বাবা তাকে গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ করতে আদেশ করেছেন; এটা এই আদেশে নিহিত অতিরিক্ত তাকিদের কারণেই হয়েছে। উপরন্তু, কখনো কখনো পিতা তাঁর আদেশকে আরো বেশি তাকিদপূর্ণ করতে পারেন এ কথা বলে, ‘বৎস, শোনো। আমি সুনির্দিষ্টভাবে তোমাকে জরুরিভিত্তিতে অমুক কাজটি করার জন্যে আদেশ করছি।’ এই আদেশটিতে অনেকগুলো তাকিদ থাকায় বোঝা যায়, সন্তানটির পক্ষে তার পিতার আদেশ না মেনে গত্যন্তর নেই।
প্রথম আদেশটিতে ওই সন্তানের জন্যে তার পিতার আদেশ অমান্য করাটা অশ্রদ্ধাশীলতার পরিচায়ক হবে; কিন্তু যখন তার পিতা নিজের আদেশে অতিরিক্ত তাকিদ যোগ করেন, তখন তিনি যেন বলেন, ‘আমি চাই তুমি শুধু অমুক কাজটি-ই করো।’ সন্তান এটা জেনেও তার বাবাকে অমান্য করলে সে সত্যি বড় এক হতভাগা বটে। আমাদের এই উদাহরণ পেশের উদ্দেশ্য হচ্ছে কেবল প্রতিপাদ্য বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করতে সহায়তা করা। নচেৎ বিশ্বজগতের মহান প্রভু ও রক্ষাকর্তার সাথে কোনো পিতার তুলনা কীভাবে চলতে পারে? (মানে চলতে পারে না)
সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা তাঁর প্রিয়নবী (ﷺ)-কে অদেশ করেন: “হে মাহবূব! আমার পক্ষ থেকে তাদের বলুন, আল্লাহর সর্বশেষ নবী (ﷺ)-এর আকারে তারা যে ‘ফযল’ ও ‘রাহমা’ লাভ করেছে, কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে জোর তাকিদসহ তা উদযাপিত হওয়া উচিত।” মওলিদুন্নবী (ﷺ)-এর খুশি উদযাপনে আল্লাহতা’লা একমাত্র যে মানদণ্ড স্থাপন করেছেন, তা হলো প্রিয়নবী (ﷺ)-কে আল্লাহরই বান্দা ও রাসূল হিসেবে স্বীকার করা; এই নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন না করে কেউ যতোই খুশি প্রকাশ ও উদযাপন করুন না কেন, তা কখনোই যথেষ্ট হবে না। আর তা হবেই বা কীভাবে, যখন আল্লাহতা’লা নিজেই এর উদযাপনের কোনো সীমারেখা বেঁধে দেননি?
মহান আল্লাহতা’লা তাঁর আজ্ঞাতে এ ইঙ্গিত করেছেন যে (মওলিদুন্নবীতে) খুশি প্রকাশের দ্বারা অর্জিত পুরস্কারের পরিমাণ অনুমানেরও অতীত। আর পরকালীন জীবনের জন্যে যা-ই প্রস্ততি নেয়া হোক না কেন, তা আল্লাহর দৃষ্টিতে মহানবী (ﷺ)-এর বেলাদত তথা ধরাধামে শুভাগমন উপলক্ষে খুশি উদযাপনে অর্জিত পুরস্কারের মতো নয়। আল্লাহতা’লা এরশাদ ফরমান, ‘তা তাদের সমস্ত (সঞ্চিত) ধন-দৌলত অপেক্ষা শ্রেয়’ [আল-ক্বুরআন, ১০:৫৮]।
এটা স্পষ্ট যে এই (খোদায়ী) অনুগ্রহ ও করুণার আবির্ভাবে কেউ নিজের খুশির অনুভূতি প্রকাশ না করলে তার এবাদত-বন্দেগী ও ধর্মীয় সাধনা-ই আল্লাহতা’লার কাছে গণ্য হবে না; প্রিয়নবী (ﷺ)-এর বেলাদত উপলক্ষে খুশি হওয়াটা (যা ঈমানদারির চিহ্ন/লক্ষণ বটে) অধিকতর বিবেচ্য হবে। নিশ্চয় ওই সব আমল পালন করা বাধ্যতামূলক, কিন্তু ওর সাথে সাথে আল্লাহর প্রিয় হাবীব (ﷺ)-এর ধরণীতলে শুভাগমনের ব্যাপারে খুশি থাকাও একান্ত আবশ্যক হবে।
__________________
মওলিদুন্নবী (ﷺ)-এর উদযাপন ও অনুমতি (১ম খণ্ড)
মূল: শায়খুল ইসলাম ড: মুহাম্মদ তাহিরুল কাদেরী
অনুবাদ: কাজী সাইফুদ্দীন হোসেন
🌍 ইসলামী বিশ্বকোষ এপ্স।
https://play.google.com/store/apps/details?id=com.islamboi.rizwan]
إرسال تعليق