আমরা কেন ‘ফযল’ ও ‘রহমত’-প্রাপ্তি উদযাপন করবো তার বর্ণনা

 

 আমরা কেন ‘ফযল’ ও ‘রহমত’-প্রাপ্তি উদযাপন করবো তার বর্ণনা

সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা কেন সূরা ইউনুসের ৫৮ নং আয়াতে তাঁর ’ফযল’ ও ‘রাহমা’-প্রাপ্তিতে আমাদেরকে খুশি/আনন্দ উদযাপন করতে আদেশ করেছেন? এর কারণ-ই বা কী, যার ওপর ভিত্তি করে তিনি এই আশীর্বাদপ্রাপ্তিতে আমাদেরকে খুশি প্রকাশ করতে দেখতে চান? এটা জানার আগে এ কথা উপলব্ধি করা জরুরি যে ‘ফযল’ ও ‘রাহমা’ শব্দ দুটি একটি নির্দিষ্ট প্রেক্ষিতে ব্যক্ত হয়েছে। বিভিন্ন আয়াতে করীমায় ক্বুরআন মজীদ এ বিষয়টির পটভূমি সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিয়েছে, যা ইতিপূর্বে আমাদের আলোচনায় আমরা উল্লেখ করেছি।

সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা মুসলমান সম্প্রদায়কে সম্বোধন করে বলেন যে তাঁর প্রিয়নবী (ﷺ)-এর ধরাধামে শুভাগমনের কল্যাণরূপী তাঁরই ‘ফযল’ ও ‘রাহমা’ না হলে আমাদের মধ্যে অধিকাংশ-ই শয়তানকে মেনে বিচ্যুত বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হতাম। মহানবী (ﷺ)-কে মানবজাতির মাঝে প্রেরণ করা না হলে কে মুসলমানদেরকে বিভ্রান্তির অন্ধকার এবং কুফর (অবিশ্বাস) ও শেরক (অংশীবাদ)-এর শৃঙ্খল হতে বাঁচাতেন, আর খোদায়ী সত্য ও হেদায়াতের আলোয় পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতেন? আমাদের এই মহান পথপ্রদর্শক না হলে মনুষ্যজাতি নৈরাজ্য, নিষ্ঠুরতা ও অত্যাচার-নিপীড়নের গভীর গর্তে পতিত হতো, আর মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা সম্ভবও হতো না।

আল্লাহতা’লার হেদায়াতের জ্যোতি মানবজাতির মাঝে যিনি নিয়ে এসেছেন, সেই মহাসম্মানিত (পবিত্র) সত্তার ধরণীতলে শুভাগমন উপলক্ষে আমাদের খুশি প্রকাশ করার জন্যে ঐশী আদেশ জারি করা হয়েছে। আমাদের প্রতি আল্লাহতা’লার অনুগ্রহ ও করুণা বর্ষণের ফলাফল-ই হচ্ছে তাঁর আশীর্বাদপূর্ণ আবির্ভাব। এ উপলক্ষে আনন্দ ও খুশি প্রকাশ করা তাই ঈমানদারির পূর্বশর্ত এবং মহানবী (ﷺ)-এর প্রতি অন্তরের ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ।




৪.৫.৪ আয়াতটিতে (ঐশী আজ্ঞা) সীমিতকরণসূচক শব্দার্থ ব্যবহারের উদ্দেশ্য

’ফাবিযা-লিকা ফালএয়াফরাহূ’ (“মুসলমানদের সেটার জন্যে আনন্দ প্রকাশ করা উচিত” ), এই ক্বুরআনের আয়াতটিতে সীমিতকরণসূচক শব্দার্থের প্রয়োগটি বিশেষ গুরুত্বসহ বিবেচনার দাবি রাখে। ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী (৫৪৩-৬০৬ হিজরী) এর ব্যাখ্যায় বলেন:

“(মুসলমানদের সেটার জন্যে আনন্দ প্রকাশ করা উচিত), আল্লাহতা’লার এই কথায় সীমিতকরণের (তথা নির্দিষ্টকরণের) প্রয়োগ বিদ্যমান; অর্থাৎ, এটা জরুরি যে মানুষেরা খুশি প্রকাশ না করেন, এ বিশেষ ক্ষেত্র ব্যতিরেকে।” [আল-রাযী রচিত ‘মাফা’তীহ আল-গায়ব’ (তাফসীরে কবীর), ১৭:১১৭] 

এই আয়াতে করীমার ব্যাখ্যায় ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী বলেন যে শরীয়তে জায়েয এমন খুশি-ই শুধু নয়, বরঞ্চ শরীয়তে শর্তারোপকৃত খুশি-ও এতে (এ ঐশী আজ্ঞায়) অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিবৃত হয়েছে যে আল্লাহতা’লার অনুগ্রহ ও করুণা সর্বোচ্চ পর্যায়ে উদযাপিত হওয়া উচিত।

প্রিয় পাঠক! আল্লাহতা’লা নিষেধ করেছেন সেসব আনন্দ-উৎসবের উদযাপন যা’তে প্রদর্শনী বিদ্যমান। পার্থিব আশীর্বাদের ক্ষেত্রে আনন্দের কোনো রকম প্রদর্শনী, যার উদযাপন গ্রহণযোগ্য মাত্রা ছাড়িয়ে যায়, তা সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা পছন্দ করেন না। তিনি পাক কালামে ঘোষণা করেন:

“নিশ্চয় আল্লাহতা’লা দাম্ভিকদের পছন্দ করেন না।” [আল-ক্বুরআন, ২৮:৭৬]

তবে মহান প্রভুর অনুগ্রহ ও করুণার প্রশ্ন উঠলে তিনি এর ব্যতিক্রম করেন। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেকের সর্বান্তঃকরণে খুশি প্রকাশ ও আনন্দ উদযাপন করা উচিত। ‘তা তাদের সমস্ত ধন-দৌলত অপেক্ষা শ্রেয়’ – আল্লাহতা’লার এই পাক কালামে আমরা দেখতে পাই যাঁরা মওলিদুন্নবী (ﷺ) উদযাপন উপলক্ষে মোমবাতি জ্বালিয়ে, জশনে জুলূস ও সভা-সমাবেশের আয়োজন করে, এবং খাবার বিতরণ করে (মহানবী সাল্লাল্লাহহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের প্রতি ভালোবাসা ব্যক্ত করতে) আনন্দ ও সুখ  প্রকাশের জন্যে এসব রীতিকে একটি মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেন, তাঁরা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহতা’লারই পছন্দনীয় আমল পালন করেন; আর এ উপলক্ষে কৃত ব্যয় তাঁদের সমস্ত সঞ্চিত ধনসম্পদ ও মালামাল হতেও উত্তম। অতঃপর মহানবী (ﷺ)-এর বেলাদতের মাস সমাগত হলে প্রিয়নবী (ﷺ)-এর খেদমতের প্রতি সকল দিক হতে উৎসাহ দেখা দেয়, আর এরই ফলে (ধর্মীয়) উদ্দীপনা বিরাজ করে। এই আশীর্বাদধন্য দিনটির জন্যে যদি দুনিয়ার সমস্ত আনন্দ-ফুর্তি কুরবানিও দিতে হয়, তবুও তা যথেষ্ট হবে না। এর অনুমতি ক্বুরআন মজীদ হতে প্রমাণিত। আল্লাহতা’লা শুধু এর উদযাপনকেই বিধিবদ্ধ করেননি, বরঞ্চ নিচের আলোচনায় আমরা (আরো) দেখতে পাবো যে এই মহা আশীর্বাদের উদযাপন আমাদের প্রতি আদিষ্টও হয়েছে।





৪.৫.৫ আয়াতোল্লিখিত ‘ফাবিযালিকা’ (সেটারই মধ্যে) কথাটি ব্যবহারের গূঢ়রহস্য

এই প্রসঙ্গে ইতিপূর্বে আমরা ‘সেটা’ – নির্দেশাত্মক সর্বনামটি প্রয়োগের ব্যাপারে তাত্ত্বিক আলোচনা করেছিলাম। এখানে আরো কিছু বিষয় নিয়ে আলাচনা করা হবে। অল্লাহতা’লা এরশাদ ফরমান:

“আপনি বলুন, ‘আল্লাহরই অনুগ্রহ ও তাঁরই দয়া (মুসলমানদের প্রতি, যা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামকে রাসূল করে প্রেরণের কারণে বর্ষিত হয়েছে), সেটারই ওপর তাদের আনন্দ প্রকাশ করা উচিত।” [আল-ক্বুরআন, ১০:৫৮]

ওপরের আয়াতটিতে যদি নির্দেশাত্মক সর্বনামটি বাদও দেয়া হতো, তাতেও এর অর্থ বোঝা যেতো। কিন্তু এর প্রয়োগের দ্বারা তাকিদ যুক্ত করা হয়েছে, যাতে আমাদের মনোযোগ অন্য দিকে সরে না যায়। অধিকন্তু, এতে আরো ইঙ্গিত রয়েছে যে কারো দ্বারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাটা কেবল নামায, রোযা ও দান-সদকাহ’র মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এগুলো আমাদের শুকরিয়া আদায়ের গ্রহণযোগ্য পন্থা বটে। কিন্তু এ মহা আশীর্বাদের আবির্ভাব, যাঁর মাধ্যমে আমরা (বাকি) সব আশীর্বাদ লাভ করেছি,  এটা এতোই বড় উপলক্ষ যে এতে সভা-সমাবেশ, আলোকসজ্জা, জশনে জুলূস ও গরিবদের মাঝে খাদ্য বিতরণের আয়োজনের মাধ্যমে এর উদযাপনকে প্রশংসনীয় করা হয়েছে। এ যেন আল্লাহতা’লা চান আমরা নিজেদের খুশি ও সুখানুভূতি প্রকাশ এমনভাবে করি, যাতে আমাদের উদযাপন প্রমাণ করে তাঁরই প্রিয়নবী (ﷺ)-কে আমাদের মাঝে প্রেরণের কারণে আমরা তাঁর (আল্লাহর) প্রতি কৃতজ্ঞ।

__________________

মওলিদুন্নবী (ﷺ)-এর উদযাপন ও অনুমতি (১ম খণ্ড)

মূল: শায়খুল ইসলাম ড: মুহাম্মদ তাহিরুল কাদেরী

অনুবাদ: কাজী সাইফুদ্দীন হোসেন

 🌍 ইসলামী বিশ্বকোষ এপ্স।

https://play.google.com/store/apps/details?id=com.islamboi.rizwan]


Post a Comment

أحدث أقدم