কুরআন দ্বারা কুরআনের তাফসীর/ব্যাখ্যা

 

কুরআন দ্বারা কুরআনের তাফসীর/ব্যাখ্যা

ওপরে উল্লেখিত আয়াতে করীমার আলোকে যদি আমরা অন্যান্য ক্বুরআনের আয়াত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করি (এটা তাফসীর আল-ক্বুরআন বিল-ক্বুরআন নামে পরিচিত), তাহলে দিবালোকের মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে যে সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লার ‘ফযল’ (অনুগ্রহ) ও ‘রাহমা’ (দয়া/করুণা) হলেন মহানবী (ﷺ)। ‘রাহমা’ শব্দটির ব্যাখ্যা সূরা আম্বিয়া’তে পাওয়ায় যায়, যেখানে আল্লাহতা’লা তাঁর শেষ নবী (ﷺ)-এর প্রতি ‘রাহমাতুল্লিল্ আলামীন’ (বিশ্বজগতের জন্যে ঐশী করুণা) লক্বব/উপাধিটি দান করেন।

১. ক্বুরআন মজীদে বিশ্বনবী (ﷺ)-কে স্পষ্টভাবে ঐশী দয়া/করুণা বলা হয়েছে: “এবং আমি আপনাকে সমগ্র জগতের জন্যে রহমতরূপেই প্রেরণ করেছি।” [আল-ক্বুরআন, ২১:১০৭, তাফসীরে নূরুল এরফান]

প্রিয়নবী (ﷺ)-কে সমস্ত সৃষ্টিকুলের জন্যে (খোদায়ী) পরম করুণার মূর্তরূপ হিসেবে সৃষ্টি করা হয়েছে, যা’তে শুধু এই বিশ্বজগত-ই নয়, বরং অন্যান্য আলম/জগত-ও অন্তর্ভুক্ত। তাঁর পবিত্র যাত (সত্তা) মোবারক-ই খোদায়ী করুণার মূর্ত প্রকাশ, যাঁকে বিশ্বমানবতার হেদায়াত তথা সঠিক পথপ্রাপ্তি ও কল্যাণে প্রেরণ করা হয়েছে। মহানবী (ﷺ)-এর মাধ্যমে এ জগতে আল্লাহতা’লার অনুগ্রহ ও দয়ার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।

২. বিশ্বনবী (ﷺ)-কে আল্লাহতা’লার অনুগ্রহ ও করুণা ঘোষণা করে আল-ক্বুরআনের অন্যত্র এরশাদ হয়েছে: “তারপর যদি আল্লাহর ‘ফযল’ (কৃপা/অনুগ্রহ) এবং তাঁর ‘রাহমা’ (করুণা) তোমাদের প্রতি না হতো, তাহলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতে।” [আল-ক্বুরআন, ২:৬৪]

৩. রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-ই যে আল্লাহর ‘ফযল’ (অনুগ্রহ) ও ‘রহমত’ (করুণা) তা নিম্নের আয়াতে করীমায় স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়: “এবং যদি তোমাদের প্রতি আল্লাহর আল্লাহর ‘ফযল’ (অনুগ্রহ) ও ’রাহমা’ (করুণা) না হতো, তবে অবশ্যই তোমরা শয়তানের অনুসরণ আরম্ভ করতে, অল্প সংখ্যক মানুষ ব্যতিরেকে।” [আল-ক্বুরআন, ৪:৮৩]

এই আয়াতে করীমায় আল্লাহতা’লা ঈমানদার মুসলমানদেরকে সার্বিকভাবে এবং সাহাবা-এ-কেরাম (رضي الله عنه)-কে সুনির্দিষ্টভাবে সম্বোধন করেছেন। প্রিয়নবী (ﷺ)-এর (ধরাধামে) শুভাগমন ও রাসূল হিসেবে প্রেরণকে আপন আশীর্বাদ হিসেবে ঘোষণা করার পাশাপাশি আল্লাহ পাক বিবৃত করেন যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম (সৃষ্ট) না হলে অধিকাংশ মানুষ শয়তানের অনুসারী হতো, যার ফলশ্রুতিতে তারা কুফরী (অবিশ্বাস) ও শেরক (অংশীবাদ)-এর শিকারে পরিণত হতো। এটা স্রেফ খোদাতা’লার এক মহা অনুগ্রহ যে তিনি তাঁর প্রিয়নবী (ﷺ)-কে সঠিক পথপ্রাপ্তির উৎসমূল হিসেবে প্রেরণ করেছেন, যার দরুন শয়তানের ধূর্তচাল ও ধোকা হতে তিনি তাদেরকে রক্ষা করেছেন।

৪. অপর এক আয়াতে করীমায় আল্লাহতা’লা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন: “নিশ্চয় আল্লাহর মহান অনুগ্রহ হয়েছে মুসলমানদের প্রতি যে তাদের মধ্যে তাদেরই মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের প্রতি তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করেন এবং তাদেরকে পবিত্র করেন, আর তাদেরকে কিতাব (আল-ক্বুরআন) ও হিকমত (ঐশী জ্ঞান-প্রজ্ঞা) শিক্ষা দান করেন; এবং তারা নিশ্চয় এর আগে স্পষ্ট গোমরাহীতে (মানে পথভ্রষ্টতায়) ছিলো।” [আল-ক্বুরআন, ৩:১৬৪]

মনোনীত এই পয়গম্বর (ﷺ)-এর প্রেরণের আগে গোটা মানবজাতি গোমরাহী ও অজ্ঞতার অন্ধকারে ডুবে ছিল। ঠিক এমন-ই এক পরিস্থিতিতে প্রিয়নবী (ﷺ)-কে মানবের মাঝে প্রেরণ করা হয়। ক্বুরআন তেলাওয়াত (পাঠ) এবং এর শিক্ষাকে ছড়িয়ে দিয়ে মনুষ্য সভ্যতাকে মানসিক দাসত্ব, অজ্ঞতা ও পথভ্রষ্টতার বন্দি-দশা হতে মুক্তি দেয়া হয়; আর ঈমানের জ্যোতি তাদের অন্তরে স্থাপন করা হয়, যার দরুন তাদের আত্মাগুলো নুবুওয়্যতের শিক্ষা দ্বারা জ্যোতির্ময় হয়ে ওঠে এবং এতে তারা মানসিক শান্তিও অর্জন করে। এটা এমন-ই এক বিশাল অনুগ্রহ ছিল যে আল্লাহতা’লা এটাকে তাঁর সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ বলে অভিহিত করেন। প্রিয়নবী (ﷺ)-কে প্রেরণ এতো বড় নেয়ামত যে “মুসলমানদের সেটার জন্যে আনন্দ প্রকাশ করা উচিত” শীর্ষক আয়াতটি এবিষয়টিকে পূর্ণ সমর্থন দেয়; ফলে ঈমানদার মুসলমানবৃন্দ যতোই খুশি প্রকাশ করুন না কেন, তা যথেষ্ট হবে না। এই খুশি স্রেফ অনুভব করা উচিত নয়, বরঞ্চ এটা প্রকাশ্যে ব্যক্ত করাও একান্ত প্রয়োজন।

৫. সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা ওপরোক্ত গুণাবলী সম্পর্কে ঘোষণা করেন:

“তিনি-ই, যিনি উম্মী মানুষদের মধ্যে তাদেরই মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করেন যেন তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করেন, তাদেরকে পবিত্র করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমতের জ্ঞান দান করেন, আর অবশ্যঅবশ্য তারা ইতিপূর্বে সুস্পষ্ট পথভ্রষ্টতার মধ্যে ছিলো।”[আল-ক্বুরআন, ৬২:২]

এই আয়াতটি আমাদের জানায় যে আমাদেরই সবচেয়ে সম্মানিত মালিক-মোখতার মহানবী (ﷺ) হলেন সেই পয়গম্বর, যিনি মানবজাতির কাছে আল্লাহতা’লার ওহী পাঠ করে তাদেরকে পথভ্রষ্টতা ও অবিশ্বাসের আবর্জনা হতে পবিত্র করেছেন। আর তিনি-ই তাদের অন্তঃস্থিত সত্তাগুলোকে অভ্যন্তরীণ অশুচিতা হতে পুতঃপবিত্র করেছেন এবং তাদেরকে জ্ঞান-প্রজ্ঞার আলো দ্বারাও উদ্ভাসিত করেছেন, যার দরুন তারা আল্লাহতা’লার আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও তাঁরই হেদায়াত তথা সত্য পথপ্রাপ্তির মহা পুরস্কার লাভ করেছেন। নচেৎ ইতিপূর্বে তারা স্পষ্ট গোমরাহীতে নিমজ্জিত ছিলেন। প্রিয়নবী (ﷺ)-এর ধরাধামে শুভাগমন নিঃসন্দেহে খোদায়ী হেদায়াতের জ্যোতির বহিঃপ্রকাশ এবং এটা আল্লাহর আশীর্বাদ ও করুণা-ও। এ জন্যেই ঈমানদারদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক।

৬. এর পরবর্তী আয়াতে করীমায় আল্লাহ পাক শেষ বিচার দিবস অবধি সকল অনাগত প্রজন্মকে এই আশীর্বাদের আওতায় নিয়ে এসেছেন:

“এবং তাদের মধ্য থেকে অন্যান্যদেরকে (মহানবীর মাধ্যমে) পবিত্র করেন এবং জ্ঞান দান করেন তাদেরকে, যারা ওই পূর্ববর্তীদের সাথে মিলিত হয়নি; এবং তিনি-ই সম্মান ও প্রজ্ঞাময়। এটা (মানে মহানবীর আগমন ও এর পাশাপাশি তাঁর আধ্যাত্মিক দয়া) আল্লাহরই অনুগ্রহ; যাকে চান দান করেন, এবং আল্লাহ বড় অনুগ্রহশীল।” [আল-ক্বুরআন, ৬২:৩-৪]

সূরা জুমু’আ’র ওপরে উল্লেখিত আয়াতে আল্লাহতা’লা তাঁর নবী (ﷺ)-কে প্রথমে একজন পয়গম্বর হিসেবে বর্ণনা করেন এবং তারপর তাঁকে আপন আশীর্বাদ হিসেবে বিভূষিত করেন। এসব আয়াতে করীমা থেকে এ বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হয় যে আল্লাহতা’লা তাঁর প্রিয়নবী (ﷺ)-কে সৃষ্টিকুলের জন্যে পয়গম্বর হিসেবে প্রেরণ করেছেন: কোনো স্থান-কাল-পাত্রকেই এর ব্যতিক্রম করা হয়নি।

মহানবী (ﷺ)-এর সঙ্গ দ্বারা যাঁরা আশীর্বাদধন্য হন, তাঁদেরকে এই উম্মতের প্রথম প্রজন্ম সাব্যস্ত করা হয়। আর তাঁদের মধ্যেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) শুভাগমন করেন (মানে তাঁর বেলাদত হয়)। সূরা জুমু’আর ৩য় আয়াতে ‘তাদের মধ্য থেকে অন্যান্যদেরকে’ উল্লেখ করা হয়েছে এবং এ সকল মানুষ হলেন তারাই, যারা মহানবী (ﷺ)-এর যাহেরী জিন্দেগীর পরে আগমন করবেন। এতে অন্তর্ভুক্ত আছেন অন্য জাতিয়তা ও সভ্যতার সকল মানুষ যারা ইসলামে দাখিল হবেন এবং উম্মতে মুহাম্মদী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)-এর সদস্য হবেন, ঠিক যেমনটি ওই আয়াতে করীমায় ঘোষিত হয়েছে, “যারা (অর্থাৎ, বর্তমান যে পরবর্তী প্রজন্ম) ওই পূর্ববর্তীদের সাথে মিলিত হয়নি।” যেহেতু তারা হুযূর পূর নূর (ﷺ) হতে ভিন্ন এক যুগে আবির্ভূত হয়েছেন, সেহেতু তাদেরকে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে গণনা করা হয়েছে যারা মহানবী (ﷺ)-এর সরাসরি দেখা-সাক্ষাৎ পাননি।

সূরা ইঊনুসের ৫৮ নং আয়াতের আরো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়ার আগে সূরা আল-জুমু’আর ৪ নং আয়াতে বিধৃত মর্মবাণী সর্বপ্রথমে যথাযথভাবে উপলুব্ধ হওয়া প্রয়োজন। এই আয়াতটির তাফসীর নিম্নরূপ: (পরের পোষ্টে দেখুন)।

__________________

মওলিদুন্নবী (ﷺ)-এর উদযাপন ও অনুমতি (১ম খণ্ড)

মূল: শায়খুল ইসলাম ড: মুহাম্মদ তাহিরুল কাদেরী

অনুবাদ: কাজী সাইফুদ্দীন হোসেন

 🌍 ইসলামী বিশ্বকোষ এপ্স।

https://play.google.com/store/apps/details?id=com.islamboi.rizwan]


Post a Comment

أحدث أقدم