শায়খ-ই ইসালের শর্তসমূহ দুই

 

শায়খ-ই ইসালের শর্তসমূহ দুই. ‘শায়খে ইসাল’ (شیخ إیصال) হচ্ছেন এমন শায়খ বা পীর যিনি উপরোক্ত শর্তাদির অধিকারী হওয়ার সাথে সাথে নফসের ক্ষতিকারক বস্তু, শয়তানের প্রতারণা, কামনা বাসনার ফাদ সম্পর্কে জ্ঞাত হবেন, অন্যকে (মুরিদকে) তরীকতের প্রশিক্ষণ দিতে জানেন এবং নিজ মুরিদের প্রতি এমন স্নেহপরায়ণ যে তাকে তার দোষত্রুটি ধরিয়ে দেন এবং সংশোধনের পন্থা বলে দেন। আর তরিকতের পথ পরিক্রমায় যতো অসুবিধার সৃষ্টি হয় তা মীমাংসা করে দেন। যিনি শুধু সালিকও নন, আবার শুধু মজযূবও নন। আওয়ারিফ শরীফে উল্লেখ আছে যে, শুধু ‘সালিক আর শুধুমাত্র ‘মাজযুব’ এরা উভয়ে পীরের উপযুক্ত নন। কারণ প্রথমজন তাে স্বয়ং এখনও (তরীকতের) পথে রয়েছেন আর অন্যজন (মুরিদকে) প্রশিক্ষণ প্রদানে অমনোযোগী। বরং এ প্রকার পীরকে হয় ‘মাজযূব-ই সালিক হতে হবে, না হয়। ‘সালিক-ই মাজযুব'। তাদের মধ্যে প্রথমজনই সর্বোত্তম। কারণ উনি হচ্ছেন মুরাদ আর ইনি হচ্ছেন মুরিদ।


১. যায়ল’য়ী, তাবয়ীনুল হাকায়িক, অধ্যায় : আল-ইমামত, ১/১৩৪, আল-মতবা'আতুল কুবরা, বুলাক, মিসর

এক. সালিক : যারা কোন কামিল পীরের সাহচর্য (ফয়েযপ্রাপ্ত) নয় অথবা কোন পীরের সাহচর্যপ্রাপ্ত হয়ে থাকলেও ফয়েয-বরকত অর্জন করে আল্লাহর প্রেমে আসক্তি ও প্রেরণা লাভ করতে পারেনি, তারা সাধারণ মুমিনের মধ্যে গণ্য। তাদের মধ্যে জজব থাকে না বলে তারা সাহিব-ই হাল' এবং 'সাহিব-ই তাসাররুফ' বা প্রভাব বিস্তারকারী নয়। তারা শুধু তালীমে ইলাহী ও ইরশাদের যোগ্যতা রাখে।


দুই. মাজযুব : ফয়েযে এলকায়ী বা এত্তেহাদী প্রাপ্ত হয়ে সদা-সর্বদা আল্লাহর প্রেমে বিভোর থাকেন এবং আল্লাহর একত্বে বিলীন হয়ে আল্লাহর গোপন রহস্যাদিতে ডুবে থাকেন তারা আল্লাহর সাথে সম্বন্ধ ও আলমে বাতেনের সাথে ঘনিষ্ঠতা রাখেন। তাই সাধারণত এই জগৎসমূহের পরিচালনার ভার তাদের ওপর ন্যস্ত হয়। তারা সাহিব-



বায়আতের প্রকারভেদ

বায়আতও দু'প্রকার। যথা-

১. বায়আতে বরকত (بیعت برکت) ও

২. বায়আতে এরাদত (بیعت إرادت) 


এক. বায়আতে বরকত হচ্ছে শুধু তাবাররুক (বরকত লাভ) এর নিমিত্তে তরীকতের সিলসিলায় প্রবেশ করা। বর্তমানে সাধারণ বায়আতসমূহ এ প্রকারই । তাও ভাল নিয়্যতে হতে হবে। অনেক বায়আত তো পার্থিব কোন ফাসিদ উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে, তা আলোচনার বাইরে। আর এ প্রকার বায়আতের জন্য পীরের মধ্যে শায়খে ইত্তিসালের শর্ত চতুষ্টয় একত্রে পাওয়া গেলেই যথেষ্ট হবে।



বায়আতে বরকতের ফযীলত


এ ‘বায়আত বরকত’ গ্রহণ করাও অনর্থক নয় বরং ইহলোক ও পরলোকে এটাও অনেক উপকারে আসবে। প্রথমত: এ দ্বারা খোদা প্রেমিকদের দফতরে নাম লেখান, তাদের সাথে সিলসিলায় সম্পৃক্ত হওয়া আসলেই সৌভাগ্যের ব্যাপার।


১.    আল্লাহর প্রকৃত গোলামদের পথে এ বিষয়ে সাদৃশ্য পাওয়া যায়। আর রাসুলুল্লাহ (ﷺ) এরশাদ করেছেন,


مَن تَشَبَّهَ بِقَومٍ فَهُوَ مِنهُم. 


‘যে যে জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত।

সায়্যিদুনা শায়খুশ শায়ূখ শিহাবুল হক ওয়াদ্দীন সােহরাওয়ার্দি রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু ‘আওয়ারিফুল মা’আরিফ গ্রন্থে বলেন,


ই হাল ও প্রভাবশালী হন। কুতুবিয়্যাত ও সাহিবে মকামের মর্যাদার অধিকারী হয়েও সুলুকে প্রত্যাবর্তন করতে পারেন না। ফলে তারা কোন তরীকতের পথের যাত্রীকে প্রশিক্ষণ প্রদান ও সুলুকের পথ দেখাতে অক্ষম।

তিন. সালেকে মজযুব : যারা কামিল পীরের সাহচর্যে ফয়েয-বরকত অর্জনে সক্ষম হয়েছেন এবং জজব ও সুলুকের সংমিশ্রণে আল্লাহ অন্বেষণ পথে সচেষ্ট থাকেন, তারা পর্যায়ক্রমে বিলায়তের সর্বোচ্চ মকাম অর্জনে সক্ষম হন। এবং তাদের মকাম অনুযায়ী প্রভাব বিস্তারেও সক্ষম। অধিক সময় তারা শান্ত অবস্থায় থাকে। ফলে হিদায়তমূলক কাজে পার্থিব জগতের সাথে সম্পর্কও রাখেন।


চার. মজযুবে সালেক : যারা কামিল পীরের কাছে সর্বপ্রকার বরকত অর্জন করে আল্লাহ প্রেমে অধিক বিভোর থাকেন, তারা পর্যায়ক্রমে বিলায়তের সকল মর্যাদা অর্জন করে আল্লাহর একত্বে মিশে যেতে সক্ষম হন এবং আল্লাহর গুপ্ত ব্যক্ত সকল রহস্য অবগত হয়ে তার জাহির-বাতিন রাজ্যসমূহের পরিচালক নিযুক্ত হন। তারা সমস্ত আলমে প্রভাব বিস্তারে পূর্ণ সামর্থবান। তাদের মধ্যে জজবের প্রাধান্য বেশি দেখা যায় । কিন্তু জজব ও সুলুক তাদের স্বভাব ও ইচ্ছাকৃত হয়ে থাকে। তারা যখন ইচ্ছা করেন সুলুকে আসতে সক্ষম হন।

- খাদিমুল ফুকরা সৈয়্যদ দেলোয়ার হোসাইন মাইজভান্ডারী রাহমাতুল্লাহি আলাইহিকৃত বিলায়তে মুতলাকা দ্রষ্টব্য


১. আবু দাউদ, আস-সুনান, کتاب اللباس, ২/২০৩, আফতাবে আলম প্রেস, লাহোর

২. আহমদ ইবনে হাম্বল, আল-মসনদ, ২/৫০ ও ৯২, আল-মাকতাবুল ইসলামী, বৈরুত


وَاعلَم أَنَّ الخِرقَةَ خِرقَتَانِ خِرقَةُ الإِرَادَةِ وَخِرقَةُ التَّبَرُّكِ وَالأَصلُ الَّذِي قَصَدَهُ المَشَایِخُ لِلمُرِیدِینَ خِرقَةُ الإِرَادَةِ وَخِرقَةُ التَّبَرُّكِ مَن تَشَبَّهَ بِخِرقَةِ الإِرَادَةِ فَخِرقَةُ الإِرَادَةِ لِلمُرِیدِ الحَقِیقِيِّ وَخِرقَةُ التَّبَرُّكِ لِلمُتَشَبِّهِ وَمَن تَشَبَّهَ بِقَومٍ فَهُوَ مِنهُم. 


‘প্রকাশ থাকে যে, খিরকা দু'টি, খিরকা-ই ইরাদত ও খিরকা-ই তাবাররুক। পীরগণ মুরিদদের থেকে খিরকা-ই ইরাদতই কামনা করেন আর খিরকা-ই তাবাররুক তাদের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বন করার নাম। তাই প্রকৃত মুরিদের জন্য খিরকা-ই ইরাদত এবং সাদৃশ্য অবলম্বনকারীদের জন্য রয়েছে খিরকা-ই তাবাররুক। যে কোন জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।


২. আসলে এটা (বায়আতে তাবাররুক) হচ্ছে আল্লাহর নৈকট্যধন্য বান্দাদের সাথে একটি মুক্তা মালায় গ্রথিত হওয়ার নাম।


ع بلبل ہمیں کہ قافیہ گل شودبس است


‘বুলবুলির জন্য ফুলের সান্নিধ্যই যথেষ্ট।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হাদীসে কুদসীতে এরশাদ করেন,


هُمُ القَومُ لاَ یَشقَی بِهِم جَلِیسُهُم. 


তারা এই সব লোক, তাঁদের সাথে উপবেশনকারীও দুর্ভাগা হয় না।


৩. খোদা-প্রেমিকগণ আল্লাহর রহমতের নিদর্শন। তাঁরা তাঁদের নাম স্মরণকারীকেও আপন করে নেন। এবং তার উপর করুণার দৃষ্টি রাখেন। প্রখ্যাত ইমাম সায়্যিদি আবুল হাসান নুরুল মিল্লাত ওয়াদ্ দ্বীন কুদ্দিসা সিররুহু ‘বাহ্জাতুল আসরার' গ্রন্থে বলেন, হুযুর পুর নূর সায়্যিদুনা গাউসুল আযম রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু থেকে জিজ্ঞাসা করা হলো যে, যদি কোন ব্যক্তি হুযুরের নাম স্মরণকারী হয় আর না সে হুযুরের তরীকায় বায়আত হয়েছে, না হুযুরের।


১. সোহরাওয়ারদী, আওয়ারিফুল মা'আরিফ,الباب الثاني عشرة, পৃ. ৭৯, মতবা'আতুল মাশহাদ আল-হুসাইনী ২. আহমদ ইবনে হাম্বল, আল-মসনদ, ২/২৫২, অ৫৯ ও ৩৮৩

২. তিরমিযী, আল-জামি, أبواب الدعوات, ২/১৯৯


খিরকা পরিধান করেছে, সে কি হুযুরের মুরিদের মধ্যে গণ্য হবেন? তখন হুযূর গাউস-ই পাক রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু বললেন,


مَنِ انتَمَي إِلَيَّ وَتُسَمِّي لِي قَبَلَهُ اللّٰهُ تَعَالَی وَتَابَ عَلَیهِ إِن کَانَ سَبِیلٍ مَکرُوهٍ وَهُوَ مِن جُملَةِ أَصحَابِي وَإِنَّ رَبِّي ﷻ وَعَدَنِي أَن یَّدخُلَ أَصحَابِي وَأَهلَ مَذهَبِي وَکُلَّ مُحِبِّ لِّيَ الجَنَّةَ. 


‘যে স্বয়ং নিজেকে আমার প্রতি সম্পৃক্ত করবে আর নিজেকে আমার গোলামদের দফতরে শামিল করবে, আল্লাহ তাকে কবুল করবেন আর যদি সে কোন অপছন্দনীয় পথে থাকে, তবে তাকে তওবা করার। অবকাশ দেবেন, আর সে আমার মুরিদদের দলের অন্তর্ভুক্ত। এবং আমার মহান রব আমার সাথে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছেন যে, তিনি আমার মুরিদ, আমার মযহাবাবলম্বী আর আমাকে যারা চায় প্রত্যেককেই জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।” (আল্লাহর জন্য সমস্ত প্রশংসা যিনি সমগ্র বিশ্বের রব)।

_____________

বায়াত ও খিলাফতের বিধান

মূল :- ইমাম আহমদ রেযা খান বেরেলভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি।

অনুবাদ: মুহাম্মদ নেজাম উদ্দীন

 🌍 ইসলামী বিশ্বকোষ এপ্স।

https://play.google.com/store/apps/details?id=com.islamboi.rizwan]

 


Post a Comment

أحدث أقدم