ফালাহ-ই ইহসান লাভের জন্য অবশ্যই মুরশিদ-ই খাসের প্রয়োজন। আর তাও শায়খ-ই ইসাল; শায়খ-ই ইত্তিসাল এ জন্য যথেষ্ট নয়। আর তার হাতে বায়’আত-ই ইরাদতই হতে হবে, বায়'আত-ই বরকত’ এখানে যথেষ্ট নয়। তরীকতের এ পথ পরিক্রমায় এমন কতেক সূক্ষ্ম ও দুর্গম পথ রয়েছে, যতক্ষণ এ পথের উঁচু-নীচু সব কিছু সম্পর্কে অবগত কামিল ও অভিজ্ঞ পথপ্রদর্শক পথ দেখিয়ে না দেবে ততক্ষণ এ পথ দিয়ে পাড়ি দেয়া সম্ভব নয়। তরীকত বিষয়ক গ্রন্থাদি অধ্যয়ন এবং ওই মতে অনুশীলন এখানে কোন কাজ দেবে না। কারণ, এটা ফালাহ-ই তাকওয়ার রহস্য ও সূক্ষ্মতার মতো সীমাবদ্ধ ও সল্পসংখ্য নয়, যা তাসাউফগ্রন্থ ধারণ করতে পারে। তাই বলা হয়
اَلطُرقُ إِلَي اللّٰهِ بِعَدَدِ أَنفَاسِ الخَلاَٸِقِ.‘সৃষ্টি জগতের শ্বাস-প্রশ্বাসের সমপরিমাণ আল্লাহর পথ রয়েছে।'
হুযুর সায়্যিদুনা গাউসূল আযম রাদ্বিয়াল্লাহ তা'আলা আনহু বলেন
إِنَّ اللّٰهَ لاَ یَتَجَلِّي لِعَبدٍ فِي صِفَتَینِ وَلاَ فِي صِفَةٍ لِعَبدَینِ.
‘আল্লাহ তা'আলা একজন বান্দার প্রতি না দু’গুণের প্রকাশ করেন, না এক গুণ দু’বান্দার (প্রতি প্রকাশ করেন)।
তাই আল্লাহর একান্ত নৈকট্যলাভের যে অগণিত পথ রয়েছে এই প্রত্যেক পথের দুর্গমতা, সূক্ষ্মতা ও অবতরণ স্থল ভিন্ন ভিন্ন, যা না নিজে বুঝতে পারবে, না তাসাউফ গ্রন্থ বলে দেবে। সে সাথে ঐ পুরাতন শত্রু, প্রতারক, অভিশপ্ত ইবলীস তো সর্বদা লেগে আছে। যদি বলে দেয়া চক্ষু, উন্মুক্ত হাত, পাকড়াওকারী ও সাহায্যকারী সাথে না থাকে, তবে আল্লাহ ভাল জানেন কোন গর্তে পতিত করে, কোন ঘাটে ধ্বংস করে বসে। তখন সূলুক (সাধনা) তো দুরে (আল্লাহ না করুক!) ঈমান পর্যন্ত হাত ছাড়া হওয়ার সম্ভাবনা
১. শাহনুফী, বাহজাতুল আসরার,
فصول من کلامه مرضعا بشيء من عجانب أحواله, পৃ. ৮২, মোস্তাফা আল-বাবী, মিশর।
রয়েছে। যেমন অনেক তরীকতপন্থীদের বেলায় এ রকম ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে। হুযুর সায়্যিদুনা গাউসূল আযম রাদ্বিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু ইবলীসের প্রতারণাকে প্রতিহত করা এবং তাকে এ বলা যে, হে আবদুল কাদের! তোমাকে তোমার ইলম রক্ষা করেছে, অন্যথায় এ প্রতারণা দ্বারা আমি সত্তরজন তরীকতপন্থীকে ধ্বংস করেছি।' (তরীকতের পথে শয়তানের এ ধরনের প্রতারণার কথা সবার জানা বিষয়)।
এখানে জেনে রাখা উচিত যে, (তরীকতপন্থী এরূপ পদচ্যুত হওয়া) কখনো এটা মুরশিদে আমের দুর্বলতার কারণে নয়, বরং এটা সালিক এর দুর্বলতা। মুরশিদে আমের মাঝে সবকিছু বিদ্যমান । যেমন, ইরশাদ হচ্ছে,
مَا فَرَّطنَا فِي الکِتَابِ مِن شَیءٍআমি এ কিতাবের মধ্যে কোন কিছু লিপিবদ্ধ করতে ত্রুটি করিনি।
কিন্তু বাহ্যিক বিধানাবলী (আহকাম-ই যাহির) সাধারণ লোক বুঝতে পারে না। ফলে সাধারণের-লোক আলিমগণের প্রতি, আলিমগণ ইমামদের প্রতি আর ইমামগণ রসূলের প্রতি ধাবিত (রুজু) হওয়া ফরয । ইরশাদ হচ্ছে,
فَسٸَلُوا أَهلَ الذِّکرِ إِن کُنتُم لاَ تَعلَمُونَ.
‘সুতরাং হে লোকরা! জ্ঞানবানদেরকে জিজ্ঞাসা করো, যদি তোমাদের জ্ঞান না থাকে।
এ বিধান মুরশিদে আমের ব্যাপারে যেমন প্রযোজ্য তেমনি এখানে ‘আহলে যিকর দ্বারা ঐ মুরশিদে খাসকেও বুঝানো হয়েছে, যার মধ্যে সবগুলো গুণাবলী বিদ্যমান।
অতএব যে ব্যক্তি এ (ফালাহ-ই ইহসান অর্জনের) পথে কদম রাখলো আর ১. কাউকে পীর ধররো না,
২. কোন বিদআতী,
৩. কোন এমন মূর্খপীরের মুরিদ হলো যে পীর ইত্তিসাল নয়,
৪. আবার এমন পীরের মুরিদ যিনি শুধু পীর-ই ইত্তেসাল কিন্তু ইসাল (খোদা পর্যন্ত পৌছিয়ে দেয়া) এর উপযুক্ত নয় আর তার উপর নির্ভর করে এ পথে পাড়ি দিতে চাইলো বা
৫. শায়খ-ই ইসালের মুরিদ কিন্তু নিজের ইচ্ছা মতো চলে, পীরের বিধানের উপর চলে না-তবে এ সব লোক এ ‘ফালাহ-ই ইহসান' লাভ করতে পারে না। ফলে এ পথে অবশ্যই তার পীর শয়তান হবে—এতে আশ্চর্যের কিছু নেই যে, হয়ত
১, এ ঘটনা বাহজাতুল আসরারসহ প্রসিদ্ধ ও বিখ্যাত ইমামদের গ্রন্থে উল্লেখ আছে।
২. আল-কুরআন, সুরা আল-আন'আম, ৬:৩৮
৩. আল-কুরআন, সুরা আন-নাহল, ১৬:৪৩
তাকে মূল ফালাহ অর্থাৎ ঈমান হতেও দূরে নিক্ষেপ করতে পারে । (আল্লাহর আশ্রয় কামনা করি।)
বরং এ প্রকার লোকদের সাথে শয়তান না থাকাটাই আশ্চর্যের ব্যাপার। এটা মনে কারো না যে, এ ভুলের দরুণ হয়ত এ পথে প্রতারণার শিকার হবে, এটা (তরীকতের অনুশীলন) তো ফরয নয়, যা না পাওয়াতে মূল ফালাহ (ঈমান)ও থাকবে না। অবশ্যই এ ধারণা ঠিক নয়, কারণ অভিশপ্ত শয়তান তো ঈমানের শত্রু, সে সর্বদা ঈমান হরণ করার সময় ও সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। সে এমন কারিশমা দেখায় যা দ্বারা ঈমান ও আকীদায় বিচ্যুতি সৃষ্টি হয়। যদি কোন লোক একটি কথা শুনলো, আর এখন স্বচক্ষে দেখলো তার বিপরীত, তবে কতো কঠিন যে নিজের চাক্ষুস দেখাকে ভুল মনে করা আর এ বিশ্বাসে অটল থাকা। অথচ শুনা কথা দেখার মত নয়। তাই পীর-ই কামিলের উচিৎ, তরীকতের পথ পরিক্রমায় এরূপ সন্দেহ জনিত বিষয়গুলোর কশফ (স্বরূপ উদঘাটন) করানো। যেমন, ইমাম কোশাইরী রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু তাঁর রিসালাতে বলেন,
إِعلَم أَنَّ فِي هَذِهِ الحَالَةِ فَلَمَّا یَخلُو المُرِیدُ فِي أَوَانِ خُلُوَّتِهِ فِي ابتِدَاءِ إِرَادَتِهِ مِنَ الوَسوَسِ فِي الإِعتِقَادِ.
‘বায়আত-ই ইরাদতের প্রারম্ভে, খিলুয়াত (নির্জন সাধনা কালে) এমন কম মুরিদই রয়েছে যে, তখন তার আকীদায় কুমন্ত্রণা আসে না।”
তাই বেশির ভাগ লোক পীর ছাড়া এ পথে চলতে গিয়ে এ সব বিপদের জালে আটকা পড়ে আর নেকড়ে শয়তান তাকে রাখালহীন ভেড়া পেয়ে গ্রাস করে নেয়। যদিও লাখের মধ্যে একজন এমন পাওয়া সম্ভব যে, যাকে খোদায়ী আকর্ষণে টেনে পীরের মধ্যস্থতা ছাড়া নফস ও শয়তানের প্রতারণা থেকে রক্ষা করেন। তার জন্য মুরশিদে আ’ম, মুরশিদে খাসের কাজ দেয়। আর তখন স্বয়ং হুযুর (ﷺ) তার মুরশিদে খাস হবে। কারণ নবীর মধ্যস্থতা ব্যতিরেখে কোন উপায়ে খোদা পর্যন্ত পৌঁছা সম্ভব নয়। তবে এটা এমন দুর্লভ বিষয়, যা দ্বারা কোন বিধান বর্তায় না।
আর বিশেষভাবে মুরশিদ ছাড়া এ পথের পথিকদের মধ্যে সে লােকই বড়ো ভাগ্যবান, যে সর্বদা রিয়াযত ও মুজাহিদায় রত আছে আর এতে যদিও সফলকাম না হয়। আর এ পথে পথ উন্মুক্ত না হওয়াতে তেমন বিপদও আসে না, তবুও সে স্বীয় ‘ফালাহ-ই তাকওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে দু’টি শর্তের ভিত্তিতে।
১. কুশায়রী, আর-রিসালা, অধ্যায় : الوصیة للمریدین পৃ. ১৮২, মোস্তাফা আলবাবী, মিসর
এক. যদি তার মুজাহিদা তাকে অহংকারী করে না তুলে এবং নিজেকে অন্যের থেকে উত্তম মনে না করে। অন্যথায় ‘ফালাহ-ই তাকওয়া' হতে হাত ধুয়ে বসবে।
দুই. তার এ কঠোর পরিশ্রম ও সাধনার পরও বঞ্চিত হওয়া তাকে যেন কোন বড় অবাঞ্চিত বিষয়ে পতিত না করে। যদি বঞ্চিত হওয়ার দুঃখে এতে এমন কোন কটুবাক্য বলে বসে, বা মনে মনে অস্বীকার করে বসে তখন তো দ্বীনি কল্যাণ (ফালাহ) লাভ করা তো দূরে, বরং তখন তার পীর শয়তান হবে। আর যদি এটা নিজের ক্রটি মনে করে আর বিনয় ও নম্রতায় অটুট থাকে তবে এ হুকুম হতে নিষ্কৃতি পাবে। সে যখন পথ পায়নি তবে পথ দিয়ে চলেই নি। আর এটা এরূপ হলো যে, শুধু ফালাহ-ই তাকওয়ার উপরই চললো।
_____________
বায়াত ও খিলাফতের বিধান
মূল :- ইমাম আহমদ রেযা খান বেরেলভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি।
অনুবাদ: মুহাম্মদ নেজাম উদ্দীন
🌍 ইসলামী বিশ্বকোষ এপ্স।
https://play.google.com/store/apps/details?id=com.islamboi.rizwan]
إرسال تعليق