ইহুদীদের ‘এয়াওমে আশুরা’কে ঈদ উৎসব হিসেবে পালন

 ইহুদীদের ‘এয়াওমে আশুরা’কে ঈদ উৎসব হিসেবে পালন      

কিছু কিছু মানুষের মনে এই আপত্তি দেখা দিতে পারে যে ইহুদী জাতি তাদের স্বাধীনতা দিবস ‘এয়াওমে আশূরা’কে রোযা রেখে স্মরণ করতেন, অথচ মওলিদুন্নবী (ﷺ)-কে অপর দিকে ঈদ হিসেবে উদযাপন করা হয়; কেননা এই দিনে কেউই তো রোযা রাখেন না।

এই আপত্তির জবাব হলো, কোনো আশীর্বাদের উপলক্ষকে খুশির দিন হিসেবে উদযাপন করা প্রিয়নবী (ﷺ)-এর সুন্নাহ। যতোক্ষণ তা শরীয়তের নির্ধারিত সীমারেখার মধ্যে থাকবে, ততোক্ষণ তা যে কোনো উপায়ে বা পন্থায় উদযাপন করা যাবে। ইহুদী জাতির আশূরা দিবসে রোযা রাখার মানে এই নয় যে অন্যান্য সব পন্থায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশের বাস্তবতা এতে নাকচ হয়ে যাবে, কেননা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ স্রেফ রোযা পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। উপরন্তু, কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একমাত্র মাধ্যম রোযা রাখা মর্মে ওপরোক্ত সিদ্ধান্তটি এসব উৎস (মানে দলিল) হতে গ্রহণ করা যায় না। বাস্তবতা হচ্ছে ইহুদী জাতি খুশির এই উপলক্ষে অতিরিক্ত পুণ্যদায়ক কর্মের অনুশীলনী (তথা আমল) হিসেবেই রোযা রাখতেন।

ইসলাম-পূর্ববর্তী যুগে আরবদের মাঝেও ‘এয়াওমে আশূরা’ উদযাপিত হতো, কিন্তু তাদের উদযাপনের উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন; এই বিষয়টি পরে ব্যাখ্যা করা হবে। প্রিয়নবী (ﷺ) যখন মদীনা মোনাওয়ারায় বসবাস আরম্ভ করেন, তখন তিনি দেখতে পান ইহুদীরা ‘এয়াওমে আশূরা’য় রোযা রাখার পাশাপাশি দিনটিকে ঈদ হিসেবেও উদযাপন করছেন। এটা নিচের হাদীসটি দ্বারা সপ্রমাণিত:

১/ – ইমাম আল-বুখারী (১৯৪-২৫৬ হিজরী) বর্ণনা করেন হযরত আবূ মূসা আল-আশআরী (رضي الله عنه) হতে; তিনি বলেন: “ইহুদী সম্প্রদায় ‘এয়াওমে আশূরা’ (আশূরা দিবস)-কে ঈদ হিসেবে বিবেচনা করতেন। (এমতাবস্থায় মুসলমানদের প্রতি আদেশ দিয়ে) মহানবী (ﷺ) বলেন, ‘এই দিনে তোমাদের রোযা রাখা উচিত’।” [আল-বুখারী, সহীহ: কিতা’ব আল-সওম (রোযা-বিষয়ক পুস্তক), ‘এয়াওমে আশূরা’র রোযা’ অধ্যায়, ২:৭০৪-৭০৫ #১৯০১]

২/ – ইমাম মুসলিম (২০৬-২৬১ হিজরী)-ও হযরত আবূ মূসা আশআরী (رضي الله عنه) হতে বর্ণনা করেন; তিনি বলেন: “আশূরা’র দিবসকে ইহুদী সম্প্রদায় ভক্তি-শ্রদ্ধা করতেন; আর তারা এটাকে ঈদ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। (তাই মুসলমানদের প্রতি আদেশ দিয়ে) মহানবী (ﷺ) বলেন, “এই দিনে তোমাদের রোযা রাখা উচিত।” [মুসলিম, সহীহ: ‘কিতা’ব আল-সিয়্যাম’ (রোযা-সংক্রান্ত পুস্তক), ‘আশূরা দিবসের রোযা’ অধ্যায়, ২:৭৯৬ #১১৩১; আল-নাসাঈ কৃত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ২:১৫৯ #২৮৪৮; আল-তাহাবী রচিত ‘শরহে মাআনী আল-আ’সা’র’: ‘কিতা’ব আল-সওম’ (রোযা-সম্পর্কিত বই), ‘এয়াওমে আশূরার রোযা’ অধ্যায়, ২:১৩৩ #৩২১৭; এবং আল-বায়হাক্বী প্রণীত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ৪:২৮৯ #৮১৯৭]    

ইমাম তাহাবী (২২৯-৩২১ হিজরী) ওপরে উদ্ধৃত হাদীসের প্রসঙ্গে বলেন যে ‘এয়াওমে আশূরা’ উপলক্ষে মহানবী (ﷺ) কর্তৃক মুসলমানদেরকে রোযা রাখার নির্দেশ দানের একমাত্র কারণ ছিল এই যে, ওই দিনটিতে ইহুদী সম্প্রদায় রোযা পালন করতেন।

৩/ – ইমাম মুসলিম (২০৬-২৬১ হিজরী) আরেকটি হাদীস বর্ণনা করেন হযরত মূসা আল-আশআরী (رضي الله عنه) হতে, যা’তে বিবৃত হয়: “খায়বার অঞ্চলের বাসিন্দাবর্গ ‘এয়াওমে আশূরা’কে ঈদ হিসেবে গ্রহণ করে রোযা রাখতেন। তারা তাদের মহিলাদেরকে অলঙ্কার ও (ধর্মীয়) চিহ্নসম্বলিত বস্তু দ্বারা সাজতে দিতেন। এমতাবস্থায় মহানবী (ﷺ) (মুসলমানদের প্রতি নির্দেশ দিয়ে) বলেন, ‘তোমাদের এ দিনে রোযা রাখা উচিত’।” [ইমাম মুসলিম রচিত ‘সহীহ’ গ্রন্থ: ‘কিতাব আল-সিয়্যাম’ (রোযা-বিষয়ক পুস্তক), ‘আশূরা দিবসের রোযা’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৭৯৬ #১১৩১; আবূ নু’আইম কৃত ‘আল-মুসনাদ আল-মুসতাখরাজ ‘আলা সহীহ আল-ইমাম মুসলিম’, ৩:২১২ #২৫৭৫; আল-ইসমাঈলী প্রণীত ’মু’জাম শুইঊখ আবী বকর আল-ইসমাঈলী’, ৩:৭২২ #৩৩৭; এবং আল-আসক্বালানী লিখিত ‘ফাতহুল বারী’, ৪:২৪৮]

সর্ব-ইমাম বুখারী (رحمة الله) ও মুসলিম (رحمة الله) বর্ণিত এসব হাদীস থেকে আমরা নিচের সিদ্ধান্তগুলো নিতে পারি:

১/ – ‘এয়াওমে আশূরা’ ইহুদীদের জন্যে ছিল এক বিজয় দিবস। দীর্ঘকাল যাবত তারা এটাকে নিজেদের সম্প্রদায়গত পর্যায়ে ঈদ হিসেবে উদযাপন করে আসছিলেন।

২/ – ইহুদীবর্গ এই দিনটিকে ঈদ হিসেবে গ্রহণ করে এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন। রোযা পালনের দ্বারা অতিরিক্ত আমল করে তারা নিজেদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

৩/ – এই দিনটিকে স্রেফ রোযা পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি, বরঞ্চ এটা ছিল উদযাপনের কেবল একটি দিক।

৪/ – সাযুজ্য দেখিয়ে কেউ যদি আপত্তি উত্থাপন করেন এ কথা বলে যে, রোযা না রেখে মওলিদুন্নবী (ﷺ) উদযাপন করার কোনো অনুমতি নেই, তাহলে এই ধরনের আপত্তি সঠিক হবে না। কেননা এ সিদ্ধান্ত (উদ্ধৃত) হাদীসগুলো থেকে নেয়া সম্ভব নয়।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইতোমধ্যে জানতেন ইহুদী জাতি ‘এয়াওমে আশূরা’কে ঈদ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। এ কারণে তিনি কখনোই এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেননি; বরঞ্চ তিনি তাদেরকে কেন তারা রোযা পালন করছেন সে ব্যাপারেই জিজ্ঞেস করেন। তারা উত্তরে বলেন যে এটা শ্রদ্ধাস্বরূপ এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশেরও নিদর্শনস্বরূপ। আর এই উত্তরের পরিপ্রেক্ষিতেই মহানবী (ﷺ) আশূরা দিবসে রোযা রাখেন এবং তাঁর সাহাবা-এ-কেরাম (رضي الله عنه)-কেও অনুরূপ আমল পালন করার নির্দেশ দান করেন।

__________________

মওলিদুন্নবী (ﷺ)-এর উদযাপন ও অনুমতি (১ম খণ্ড)

মূল: শায়খুল ইসলাম ড: মুহাম্মদ তাহিরুল কাদেরী

অনুবাদ: কাজী সাইফুদ্দীন হোসেন

 🌍 ইসলামী বিশ্বকোষ এপ্স।

https://play.google.com/store/apps/details?id=com.islamboi.rizwan]


Post a Comment

أحدث أقدم