নামাযের ক্বিরআত


(টীকাঃ ১)


দরসে হাদীসঃ [হাদীস নং- (৭৬৬)]


[ﻋﻦ ﻋﺒﺎﺩﺓ ﺑﻦ ﺍﻟﺼﺎﻣﺖ ﻗﺎﻝ ﻗﺎﻝ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﷺ ﻻ ﺻﻠﻮﺓ ﻟﻤﻦ ﻟﻢ ﻳﻘﺮﺃ ﺑﻔﺎﺗﺤﺔ ﺍﻟﻜﺘﺎﺏ - ﻣﺘﻔﻖ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﻓﻰ ﺭﻭﺍﻳﺔ ﻟﻤﺴﻠﻢ ﻟﻤﻦ ﻟﻢ ﻳﻘﺮﺃ ﺑﺎﻡ ﺍﻟﻘﺮﺍﻥ ﻓﺼﺎﻋﺪﺍ .]


হযরত ওবাদাহ্ ইবনে সামিত [ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻨﻪ] হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ [ﷺ] এরশাদ করেছেনঃ


"যে সূরা ফাতিহা পাঠ করে না তার নামায নেই। (টীকাঃ ২) [মুসলিম ও বোখারী] মুসলিমের বর্ণনায় আছে, "ওই ব্যক্তির নামায নেই, যে সূরা ফাতিহা এবং ততোধিক কিছু পড়েনি।" (টীকাঃ ৩)


□ উক্ত হাদীস শরীফের ব্যাখায় বলা হয়েছেঃ



___________________________________


◇ টীকাঃ ১.


নামাযের মধ্যে ক্বোরআন করীমের একটি দীর্ঘ আয়াত অথবা তিনটি ছোট আয়াত পড়া ফরয। 'সূরা ফাতিহা' এবং সেটার সাথে অন্য সূরা মিলানো ওয়াজিব। ফরয নামাযের প্রথম দু'রাক্'আতে ক্বোরআন তিলাওয়াত করা ফরয। বাকী রাক্'আতসমূহে নফল। ফরয ছাড়া অন্য সব নামাযের প্রত্যেক রাক্'আতে ক্বোরআন পাঠ ফরয। এর বিস্তারিত মাস্'আলাসমূহ ফিক্বহ'র কিতাবাদিতে দেখুন। স্মর্তব্য যে, নামাযের ভিত্তি 'নামাযের কর্মসমূহ' ( ﺍﻓﻌﺎﻝ) সম্পাদনের উপর প্রতিষ্ঠিত, পাঠ করা ( ﺍﻗﻮﺍﻝ ) -এর উপর নয়। তাই বোবার উপর নামায ফরয। যদিও সে ক্বোরআন তিলাওয়াত করতে পারে না। কিন্তু যে ব্যক্তি নামাযের রুকনসমূহ একেবারে সম্পাদন করতে পারে না, তার জন্য নামায না পড়া ক্ষমাযোগ্য।


◇ টীকাঃ ২.


হানাফীদের মতে 'সূরা ফাতিহা' পাঠ করা ওয়াজিব, ফরয নয়। কতেক ইমামের মতে ফরয। তাঁরা হাদীসের এ অর্থ করেন যে, যে ফাতিহা পড়ে না, তার নামায সহীহ্ (বিশুদ্ধ) নয়। আমরা এ অর্থ এভাবে করি যে, 'যে সূরা ফাতিহা পড়ে না, তার নামায কামিল (পরিপূর্ণ) নয়। অর্থাৎ ﻻﺀﻧﻔﻯﺠﻨﺲ -এর ﺧﺒﺮ (বিধেয়) তাঁদের মতে 'সহীহ্' বা (বিশুদ্ধ) উহ্য হবে আর আমাদের মতে 'কামিল' বা পূর্ণাঙ্গ। কিন্তু হানাফী মাযহাব অন্যন্ত শক্তিশালী। তাঁদের (হানাফীদের) এ তরজমা এ কয়েকটি কারণে অত্যন্ত যুক্তিযুক্তঃ


○ প্রথমতঃ হানাফীদের তরজমার ভিত্তিতে আলোচ্য হাদীস ক্বোরআনের এ আয়াতের বিরোধী নয়। এরশাদ হচ্ছে- [ﻓَﺎﻗْﺮَﺀُﻭﺍ ﻣَﺎ ﺗَﻴَﺴَّﺮَ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﻘُﺮْﺁﻥِ]


তরজমাঃ (এখন ক্বোরআনের মধ্য থেকে যতটুকু তোমাদের নিকট সহজ হয়, ততটুকু পাঠ করো। ৭৩:২০) পক্ষান্তরে, ওইসব বুযুর্গের তরজমার ভিত্তিতে আলোচ্য হাদীস এ আয়াতের ঘোর বিরোধী হবে। কেননা, ক্বোরআন দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, শর্তহীনভাবে (অর্থাৎ ক্বোরআনের যে কোন আয়াত বা সূরা তিলাওয়াত করলে) যথেষ্ট (বিশুদ্ধ) হবে। আর হাদীস বলছে- সূরা ফাতিহা পাঠ করা ব্যতীত নামায বিশুদ্ধ হয় না।


○ দ্বিতীয়তঃ এ হাদীসের শেষাংশে বর্ণিত হয়েছে যে, যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহা এবং এর সাথে ক্বোরআন থেকে অন্য কিছু পড়ে না, তার নামায হবে না। আর ওই সব বুযুর্গের মতে অন্য সূরা মিলানো ফরয নয়। তাই একই হাদীস দ্বারা সূরা ফাতিহা পড়া ফরয মনে করা আর তার সাথে অন্য সূরা মিলানোকে ফরয মনে না করা আজব ধরনের কথা হয়।


○ তৃতীয়তঃ পরবর্তীতে হযরত আবূ হুরাইরা [ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻨﻪ] কর্তৃক বর্ণিত হাদীসের মধ্যে হানাফীদের কৃত অর্থ স্পষ্টভাবে আসছে। তা হচ্ছে যে ব্যক্তি নামাযের মধ্য 'আলহামদু' পড়বে না, তার নামায অসম্পূর্ণ। বস্তুতঃ হাদীসের ব্যাখ্যা হাদীস দ্বারা হলে তা শক্তিশালী হয়। তদুপরি, হানাফীদের মতে 'সূরা ফাতিহা' পড়া মানে শর্তহীনভাবে ( ﻣﻄﺎﻗﺎ ) পড়া, তা 'হাক্বীক্বী' (প্রত্যক্ষভাবে) হোক, বা 'হুকমী' (পরোক্ষভাবে) হোক; যেমন শুধু ইমামই হাক্বীক্বী বা প্রত্যক্ষভাবে পড়বেন আর মুক্তাদীরা পড়বে পরোক্ষভাবে। অর্থাৎ ইমামের পড়াকে মুক্বতাদীদের পড়া হিসেবে ধরে নেওয়া হবে।


কিন্তু কোন কোন ইমামের মতে এখানে হাক্বীক্বী (প্রত্যক্ষভাবে) পড়াই উদ্দেশ্য। তাঁদের মতে, মুক্বতাদীর উপরও 'সূরা ফাতিহা' পড়া ফরয; কিন্তু হানাফীদের অভিমত কতেক কারণে অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য। ওই কারণগুলো হচ্ছেঃ


○ প্রথমতঃ এতদভিত্তিতে আলোচ্য হাদীস ক্বোরআনের এ-ই আয়াতের বিরোধী হবে না।


[ﻭَﺇِﺫَﺍ ﻗُﺮِﺉَ ﺍﻟْﻘُﺮْﺁﻥُ ﻓَﺎﺳْﺘَﻤِﻌُﻮﺍ ﻟَﻪُ ﻭَﺃَﻧﺼِﺘُﻮﺍ]


তরজমাঃ আর যখন ক্বোরআন পাঠ করা হবে, তখন তোমরা মনযোগ সহকারে সেটা শ্রবণ করো এবং নিশ্চুপ থাকো। (৭ঃ২০৪) তাঁদের ব্যাখ্যা মতে, আয়াত ও হাদীসের মধ্যে বড় বিরোধ বেঁধে যায়।


○ দ্বিতীয়তঃ এতদভিত্তিতে এ হাদীস মুসলিম শরীফের নিন্মোক্ত বর্ণনার বিরোধী হবে নাঃ [ﻭﺍﺫﺍ ﻗﺮﺀ ﻓﺎﻧﺼﺘﻮﺍ]


(অর্থাৎ যখন ইমাম ক্বিরআত সম্পন্ন করবে, তখন তোমরা নিরব থাকো!)


○ তৃতীয়তঃ হানাফীদের কৃত তরজমা অনুসারে যে ব্যক্তি ইমামের সাথে রুকূ' পাবে, সে অনায়াসে ওই রাক্'আত পাবে; কিন্তু তারা (যাঁরা মুক্বতাদীর উপরও সূরা ফাতিহা পড়া ওয়াজিব বলেন) এ মাসআলায় সমূহ বিপদের সম্মুখীন হবেন। যেমন- সূরা ফাতিহা পড়া ব্যতীত রাক্'আত কিভাবে পাবেন?


○ চতুর্থতঃ কতেক অবস্থায় তারা তো এ হাদীসের উপর আমল করতেই পারবেন না। যেমন, মুক্বতাদী সূরা ফাতিহা পড়ার সময় মধ্যখানে ইমাম রুকূ'তে চলে গেলেন, তখন তো তার জন্য এ হাদীস প্রাণ বিনাশকারী শাস্তির মতো হয়ে যাবে।


তাই হানাফী মাযহাব অত্যন্ত শক্তিশালী। আর এ হাদীস তাঁদের মোটেই বিরোধী নয়। এতদ্ সম্পর্কে গবেষণালব্ধ বিশ্লেষণ আমার কিতাব 'জা-আল হক্ব': দ্বিতীয় খন্ডে দেখুন।


◇ টীকাঃ ৩.


অর্থাৎ নামাযীদের জন্য সূরা ফাতিহা পড়াও ওয়াজিব এবং এটার সাথে আরো কিছু আয়াত তিলাওয়াত করাও ওয়াজিব। যদি ওইগুলোর মধ্যে যে কোন একটার উপর আমল করা না হয়, তবে নামায অসম্পূর্ণ হবে। (তখন ওয়াজিব বাদ পড়ার কারণে সাজদা-ই সাহ্ভ দিতে হবে।) এ হাদীস হানাফীদের জন্য শক্তিশালী দলীল। যারা এ হাদীসের উপর ভিত্তি করে প্রত্যেক নামাযীর উপর সূরা ফাতিহা পড়া ফরয বলেন, তারা ﻓﺼﺎﻋﺪﺍ (কিছু অতিরিক্ত) শব্দের কি ব্যাখ্যা দেবেন? কেননা, তাঁদের মতে তো সূরা-ফাতিহার সাথে অন্য সূরা মিলানো ফরয নয়।


প্রচারেঃ Ishq-E-Mustafa ﷺ


□ হাদীস শরীফের ব্যাখ্যা সম্বলিত টীকা পেতে সার্চ করুনঃ


f/Ishq-E-Mustafa ﷺ


[সূত্রঃ মিরআতুল মানাজীহ শরহে মিশকাতুল মাসাবীহ, কৃত- মুফতী আহমদ ইয়ার খান নঈমী আশরাফী বদায়ূনী, বঙ্গানুবাদঃ মাওলানা আব্দুল মান্নান, ২য় খন্ড, পৃ. (৪৩-৪৪), হাদীস নং-৭৬৬ এর টীকাঃ (১-৩) দ্রব্যষ্ট, প্রকাশনায়ঃ ইমাম আহমদ রেযা রিসার্চ একাডেমী, চট্টগ্রাম।

 🌍 ইসলামী বিশ্বকোষ এপ্স।

https://play.google.com/store/apps/details?id=com.islamboi.rizwan]


Post a Comment

أحدث أقدم