প্রথমত: মুরশিদ পীর দু'প্রকার।
১. মুরশিদ-ই আ’ম (مرشد عام), ও
২. মুরশিদ-ই খাস (مرشد خاص)
এক. মুরশিদ-ই আ’ম হচ্ছে আল্লাহর বাণী, রাসুলের বাণী, শরীয়ত ও তরীকতের ইমামদের বাণী, সত্য ও সঠিক পথের দিশারী দ্বীনদার আলিমগণের বাণী। এ পরম্পরায় সাধারণ লোকের পীর হচ্ছে আলিমগণের বাণী, ইমামগণের মুরশিদ হচ্ছে। রসূলের বাণী আর রসূলের পেশওয়া হলেন স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা। অতএব ‘ফালাহ-ই যাহির' এবং ‘ফালাহ-ই বাতিনা’ এ উভয় প্রকার সফলতা অর্জনের জন্য এ মুরশিদ-ই আমের অনুসরণ ছাড়া সম্ভব নয়। যে কেউ এটা হতে পৃথক হবে, নিঃসন্দেহে সে কাফির বা পথভ্রষ্ট আর তার সব ইবাদত ক্ষতি ও ধ্বংসে পর্যবসিত হবে।
দুই. মুরশিদে খাস, এমন পীরকে বলে যার আকীদা ও আমল বিশুদ্ধ এবং যিনি বায়আতের সকল শর্তের ধারক ও বাহক, যার হাতে যে কোন লোক হাতে হাত রেখে বায়আত গ্রহণ করেন। এ মুরশিদে খাস, যাকে আমাদের পরিভাষায় ‘পীর’ বা ‘শায়খ’ বলা হয় ।
১. আল-কুরআন, সুরা আলে ইমরান, ৩:১৮৫
২. আল-কুরআন, সুরা ইউনুস, ১০:৬২
অতঃপর এ ‘মুরশিদে খাস’ আবার দু'প্রকার। যথা—
এক. শায়খ-ই ইত্তিসাল’ (شیخ إتصال) হচ্ছেন এমন পীর যার হাতে বায়আত গ্রহণের মাধ্যমে মানুষের সম্পর্ক পরম্পরা হুযুর পুরনুর সায়্যিদুল মুরসালীন (ﷺ) পর্যন্ত গিয়ে সংযুক্ত হয় ।
শায়খে ইত্তিসাল ও তার চারটি শর্ত এ প্রকার পীরের জন্য চারটি শর্ত অপরিহার্য। যথা-
১. তরীকতের শায়খের সিলসিলা পরম্পরা সঠিক পন্থায় হুযুর আকদাস (ﷺ) পর্যন্ত পৌঁছা, মধ্যখানে কেউ বাদ না পড়া। কারণ বাদ পড়ার কারণে রসুল (ﷺ) পর্যন্ত যোগসূত্র স্থাপন অসম্ভব।
কতেক লোক বায়আত ছাড়া বাপ-দাদার পীর হওয়ার সুবাদে উত্তরাধিকারসূত্রে পীরের আসনে বসে যায় অথবা বায়আত থাকলেও খিলাফত মিলেনি আর বায়আত করানোর অনুমতি ছাড়াই মুরিদ করা আরম্ভ করে দেয়, অথবা এমন সিলসিলা যার ধারাবাহিকতা বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে- যাতে কোন ফয়য রাখা হয়নি, লোকেরাও এতে অনুমতি ও খিলাফত দিয়ে দেন ; অথবা মূলত: সিলসিলাটা সঠিক কিন্তু মাঝখানে কোন এমন লোক আছে যার মধ্যে পীর হওয়ার অন্যান্য শর্তাদি না থাকার কারণে বায়আতের যোগ্যতা হারিয়েছে, ফলে তার মাধ্যমে সিলসিলার যে শাখা আরম্ভ হয়, তা হতে এটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে- এ সব পদ্ধতিতে এ বায়আত দ্বারা কখনো ইত্তেসাল বা রসূল (ﷺ) পর্যন্ত যোগসূত্র স্থাপন করা সম্ভব নয়। মূলত এটা ষাড় হতে দুধ বা বাঝা গাভী হতে বাচ্চা কামনা করার মতো।
২. তরীকতের শায়খ সুন্নী ও বিশুদ্ধ আকীদাধারী হওয়া। বদমযহাব, গোমরাহদের সিলসিলা শয়তান পর্যন্ত পৌঁছবে, রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) পর্যন্ত নয়। বর্তমানে প্রকাশ্য অনেক বেদ্বীন, এমনকি ওহাবীরা-যারা শুরু হতেই আউলিয়া কিরামকে অস্বীকারকারী ও তাদের শত্রু তারাও সরলমনা মুসলমানদেরকে প্রতারিত করার জন্য পীর-মুরিদির জাল বিস্তার করে রেখেছে- তাদের ধোকা হতে হুশিয়ার! খবরদার! সাবধান! সাবধান!
بسا ابلیس آدم روٸے ہست پس بہبر دستے نباید داد دست
‘পৃথিবীতে মানবাকৃতিতে বহু নররুপী শয়তান রয়েছে। সুতরাং বাচবিচার না করে যার তার হাতে হাত দেওয়া উচিৎ নয়।'
৩. আলিম হওয়া : তরীকতের শায়খকে আলেম হতে হবে। অর্থাৎ নিজের প্রয়োজন মতো ইলমে ফিকায় যথেষ্ট পারদর্শী হতে হবে, আহলে সুন্নাত-এর আকীদাগুলো সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান থাকতে হবে। কুফর ও ইসলাম, গোমরাহী ও হিদায়তের মধ্যে পার্থক্য নিরূপনে খুব দক্ষ হতে হবে। অন্যথায় আজকে যদিও বদমযহাবী নয়, কিন্তু পরে পথচ্যুত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। প্রবাদ আছে যে,
ع فَمَن لَم یَعرِفِ الشَّرَّ فَیَومَا یَقَعُ فِیهِ.
‘যে মন্দ সম্পর্কে অবহিত নয়, একদিন সে তথায় পতিত হয়।'
এমন শত শত কথা ও কর্ম আছে, যা দ্বারা কুফর সাব্যস্থ হয় আর মূখ মূর্খতার কারণে তাতে আটকা পড়ে। কোন কথা ও কর্ম দ্বারা কুফর প্রকাশ পায় প্রথমতো তা সে জানেও না, আর না জানার দরুণ তওবা করাও অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ফলে নিজের অজান্তে কুফরের উপর ডুবে থাকে। আর (ভাগ্যক্রমে) কেউ যদি তার কুফর সম্পর্কে বলে দেয়, তবে নম্র ও ভদ্র স্বভাবের অধিকারী মুখতো তাতে ভয়ও পায় আর তওবাও করে নেয়। কিন্তু ওই সাজ্জাদানশীন-যার পূর্বপুরুষ পীর হওয়ার সুবাদে নিজে হাদি ও মুরশিদ বনে বসে আছে তার হৃদয়ে তো বড়ত্ব ও অহংবোধ বিরাজ করছে, সে কী করে তার ভুল স্বীকার করবে!
কুরআন করিমের ভাষায়
وَإِذَا قِیلَ لَهُ اُتَّقِ اللّٰهَ أَخَذَتهُ العِزَّةُ بِالإِثمِ.
‘যখন তাকে বলা হয়, আল্লাহকে ভয় কর, তখন তার আত্মাভিমান তাকে পাপানুষ্ঠানে লিপ্ত করে।”
আর পক্ষান্তরে যদি সে ভালো লোক হয় এবং নিজের ভুলও মেনে নেয় তবে তখন তওবা করে নেবে ঠিকই কিন্তু তার কুফরী কথা ও কর্ম দ্বারা যে বায়আত বাতিল হয়ে গেছে এতে সে কি এখন নতুনভাবে অন্যের হাতে বায়আত গ্রহণ করবে, আর শাজরাও ঐ নতুন পীরের নামে দেবে কী? যদিও প্রথম পীরের খলীফা হয়। এটা তার নফস কিভাবে মেনে নেবে? আর না আজ হতে সিলসিলা বন্ধ করে মুরিদ করা ছেড়ে দেয়াতে রাজি হবে? বরং যে অগত্যা ওই বিচ্ছিন্ন সিলসিলাই জারি রাখবে। তাই, এ সব কারণে পীরকে আহলে সুন্নাতের যাবতীয় আকীদার জ্ঞানে জ্ঞানী হওয়া অপরিহার্য।
* আল-কুরআন, সুরা আল-বাকারা, ২:২০৬
৪. পীর ফাসিক-ই মুলান (প্রকাশ্য ফাসিক) না হওয়া। এ শেষোক্ত শর্ত ইত্তিসাল অর্জনের জন্য নির্ভরশীল নয়; কারণ, পীরের শাজরা শুধু ফিসক ও ফজুর (পাপাচার)-এর কারণে (সিলসিলার যোগসূত্র) রহিত হয় না। তবে পীরের সম্মান করা অপরিহার্য আর ফাসিককে অবজ্ঞা করা ওয়াজিব। আর উভয়ের সংমিশ্রণটা বাতিল। কারণ, এতে দুই বিপরীতধর্মী বস্তুর একত্রিত করণ (إجتماع) আবশ্যক হয়ে যায় । ইমাম যীইলীর তাবয়ীনুল হাকায়িক ও অন্যান্য কিতাবে ফাসিক সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে,
وَلِأَنَّ فِي تَقدِیمِهِ لِلإِمَمَةِ تَعظِیمَهُ وَقَد وَجَبَ عَلَیهِم إهَانَتُهُ شَرعًا.
‘ইমামতের জন্য তাকে অগ্রগামী করা হচ্ছে তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন আর শরীয়ত তাকে অবজ্ঞা করা ওয়াজিব করে দিয়েছে।”
_____________
বায়াত ও খিলাফতের বিধান
মূল :- ইমাম আহমদ রেযা খান বেরেলভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি।
অনুবাদ: মুহাম্মদ নেজাম উদ্দীন
🌍 ইসলামী বিশ্বকোষ এপ্স।
https://play.google.com/store/apps/details?id=com.islamboi.rizwan]
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন