হযরত সায়্যিদুনা ঈসা রূহুল্লাহ عَلى نَبِيِّنَا وَعَلَيهِ الصَّلٰوةُ وَالسَّلَام এর আপাদমস্তক মর্যাদাপূর্ণ দরবারে হাওয়ারীগণ (তাঁর সাথীগণ) আরয করলেন যে, আপনার প্রতিপালক (কি) আপনার দোয়াতে এ দয়াটুকু করবেন যে, আমাদের কাছে আসমান থেকে নেয়ামত সমূহে ভরা গায়েবী দস্তরখানা অবতীর্ণ হবে? এ কথায় হযরত সায়্যিদুনা ঈসা রূহুল্লাহ عَلى نَبِيِّنَا وَعَلَيهِ الصَّلٰوةُ وَالسَّلَام বললেন: “এ ধরণের চাওয়া চেয়াে না। আল্লাহকে ভয় কর। ইচ্ছামত মুজিযা দেখতে চেয়াে না। যদি তােমরা মুমিন হও তবে এসব থেকে বিরত থাকো।” প্রতিউত্তরে আরয করলেন: “হুযুর! আমাদের এ আবেদন আপনার عَلى نَبِيِّنَا وَعَلَيهِ الصَّلٰوةُ وَالسَّلَام নবুয়ত কিংবা রব তাআলার পরিপূর্ণ কুদরতে কোন প্রকার সন্দেহের ভিত্তিতে নয় বরং এটার চারটি উদ্দেশ্য রয়েছে:
(১) প্রথমত, আমরা ঐ গায়বী খাবার খাব, বরকত লাভ করব, তাতে আমাদের অন্তর আলােকিত হয়ে যাবে। আমাদের আল্লাহর নৈকট্য আরাে অধিক অর্জিত হবে।
(২) দ্বিতীয়ত, আপনি عَلى نَبِيِّنَا وَعَلَيهِ الصَّلٰوةُ وَالسَّلَام আমাদের সাথে ওয়াদা করে বলেছেন: তােমরা মকবুলুদ দোয়া, রব্বে তাআলা তােমাদের কথা শুনেন, এই কথাটির উপর দৃঢ় বিশ্বাস আমাদের অর্জিত হবে, আমাদের অন্তর প্রশান্ত হয়ে যাবে। আমাদের পরিপূর্ণ ঈমানদার হওয়ার ব্যাপারে সান্ত্বনা লাভ হবে।
(৩) তৃতীয়ত এর , আপনার عَلى نَبِيِّنَا وَعَلَيهِ الصَّلٰوةُ وَالسَّلَام সত্য হওয়ার ব্যাপারটি যেন চাক্ষুস ভাবে প্রমাণিত হয়ে যায়।
(৪) চতুর্থত, আমরা এ আসমানী মুজিযা লক্ষ্য করে নেব এবং অন্যদের জন্য আমরা প্রত্যক্ষ সাক্ষী হয়ে যাব। এছাড়া কিয়ামত পর্যন্ত মানুষের জন্য আমাদের এ ঘটনা ঈমান সতেজতার করার মাধ্যম হবে। আমরা আপনার চিরস্থায়ী সাক্ষী হয়ে যাব।
রাসুলুল্লাহ্ ﷺ ইরশাদ করেছেন: “যে ব্যক্তির নিকট আমার আলােচনা হল আর সে আমার উপর দরূদ শরীফ পাঠ করল না তবে সে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে কৃপণ ব্যক্তি।” (আত তারগীব ওয়াত তারহীব)
হযরত সায়্যিদুনা সালমান ফারসী, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস ও প্রসিদ্ধ মুফাসসিরগণের رحمة اللّٰه تعالىٰ عليه বক্তব্য এযে, যখন হাওয়ারীগণ হযরত সায়্যিদুনা ঈসা রূহুল্লাহ্ عَلى نَبِيِّنَا وَعَلَيهِ الصَّلٰوةُ وَالسَّلَام কে সব দিক থেকে আশ্বস্ত করলেন যে, আমরা এ (খাবার) দস্তরখানা শুধুমাত্র আনন্দ উদ্দীপনা উপভােগের জন্য চাচ্ছি না বরং এতে আমাদের দ্বীনি উদ্দেশ্য রয়েছে। তখন হযরত সায়্যিদুনা ঈসা রূহুল্লাহ্ عَلى نَبِيِّنَا وَعَلَيهِ الصَّلٰوةُ وَالسَّلَام চটের পােষাক পরিধান করলেন এবং কেঁদে কেঁদে দোয়া করলেন:
اللّٰہُمَّ رَبَّنَاۤ اَنۡزِلۡ عَلَیۡنَا مَآئِدَۃً مِّنَ السَّمَآءِ تَکُوۡنُ لَنَا عِیۡدًا لِّاَوَّلِنَا وَ اٰخِرِنَا وَ اٰیَۃً مِّنۡکَ ۚ وَ ارۡزُقۡنَا وَ اَنۡتَ خَیۡرُ الرّٰزِقِیۡنَ ﴿۱۱۴﴾
কানযুল ঈমান থেকে অনুবাদ: “হে আল্লাহ! হে প্রতিপালক! আমাদের উপর আকাশ থেকে একটা খাদ্য খাঞ্চা' অবতরণ করুন, যা আমাদের জন্য ঈদ (আনন্দ-উৎসব) হবে আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলের জন্য এবং আপনারই নিকট এবং আমাদেরকে রিযিকদান করুন, আর আপনিইতাে সর্বশ্রেষ্ঠ রিযিকদাতা।” (পারা- ৭, সূরা মায়েদা, আয়াত- ১১৪)
তাঁরা সবাই এটা অবতীর্ণ হওয়ার সময় দেখছিলেন যে, লাল বর্ণের দস্তরখানা মেঘের সাথে মিশে ধীরে ধীরে নীচে নেমে এল। শেষ পর্যন্ত মানুষের মাঝখানে রাখা হল। হযরত সায়্যিদুনা ঈসা রূহুল্লাহ্ عَلى نَبِيِّنَا وَعَلَيهِ الصَّلٰوةُ وَالسَّلَام এ দস্তরখানাটি দেখে অনেক কাঁদলেন ও দোয়া করলেন: “মাওলা! আমাকে কৃতজ্ঞদের অন্তর্ভূক্ত করাে। ইলাহী! এটা এ সকল হাওয়ারীদের জন্য রহমত বানাও, আযাব বানিওনা।” হাওয়ারীগণ এটা থেকে এমন সুগন্ধ অনুভব করলেন, যা এর আগে কখনাে অনুভব করেন নি। হযরত সায়্যিদুনা ঈসা রূহুল্লাহ্ عَلى نَبِيِّنَا وَعَلَيهِ الصَّلٰوةُ وَالسَّلَام ও হাওয়ারীগণ শুকরিয়ার সিজদায় পড়ে গেলেন।
রাসুলুল্লাহ্ ﷺ ইরশাদ করেছেন: “তােমরা যেখানেই থাক আমার উপর দরূদে পাক পড়, কেননা তােমাদের দরূদ আমার নিকট পৌঁছে থাকে।” (তাবারানী)
হযরত সায়্যিদুনা ঈসা রূহুল্লাহ্ عَلى نَبِيِّنَا وَعَلَيهِ الصَّلٰوةُ وَالسَّلَام বললেন: “এটা কে খুলবে? এ দস্তরখানা লাল গিলাফে আচ্ছাদিত ছিল। সকলে আর্য করলেন: “হুযুর! আপনিই খুলুন। সুতরাং হযরত সায়্যিদুনা ঈসা রূহুল্লাহ্ عَلى نَبِيِّنَا وَعَلَيهِ الصَّلٰوةُ وَالسَّلَام পুনরায় তাজা ওযু করলেন, নফল নামায পড়লেন, দীর্ঘক্ষণ দোয়া করলেন অতঃপর দস্তরখানা থেকে গিলাফ সরালেন। তাতে এসব বস্তু ছিল; সাতটি মাছ, সাতটি রুটি, এসব মাছের উপর আঁশ ছিল না, ভেতরে কাঁটা ছিল না। তা থেকে তেল ঝরছিল, ওগুলাের মাথার অগ্রভাগে সিরকা, লেজের দিকে লবণ, আশে-পাশে সবজী ছিল। কিছু বর্ণনায় রয়েছে, পাঁচটি রুটি ছিল। একটি রুটিতে যায়ন, অন্যটিতে মধু, তৃতীয়টিতে ঘি, চতুর্থটিতে মাখন, পঞ্চমটিতে ভুনা মাংস ছিল। শামউন নামক হাওয়ারী জিজ্ঞাসা করলেন: “হে রূহুল্লাহ! এ খাবার জান্নাতের নাকি জমিনের?” বললেন: “না জমিনের, না জান্নাতের” এটা কেবল কুদরতী।” প্রথমে অসুস্থ, ফকীর, ক্ষুধার্ত, কুষ্ঠরােগী ও পঙ্গুদেরকে ডাকা হল। তিনি عَلى نَبِيِّنَا وَعَلَيهِ الصَّلٰوةُ وَالسَّلَام বললেন: بِسمِ اللّٰه পড়ে খাও, (এটা) তােমাদের জন্য বরকতময় আর অস্বীকারকারীদের জন্য মুসিবত (স্বরূপ)।” এরপর অন্যদেরকেও তিনি এরূপ বললেন। সুতরাং প্রথম দিন সাত হাজার তিনশত জন খেল। অতঃপর ঐ দস্তরখানা উঠে গেল। লােকেরা দেখতে লাগল। উড়ে তাদের দৃষ্টি থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল। সকল রােগী, মুসিবতগ্রস্থ ব্যক্তি সুস্থ হয়ে গেল, ফকীরেরা ধনী হয়ে গেল। এরপর এ দস্তরখানা ধারাবাহিকভাবে ৪০ দিন অথবা ১ দিন পর ১ দিন আসতে থাকে। লােকেরা খেতে বসল। অতঃপর হযরত সায়্যিদুনা ঈসা রূহুল্লাহ্ عَلى نَبِيِّنَا وَعَلَيهِ الصَّلٰوةُ وَالسَّلَام এর নিকট ওহী আসল যে, এখন এটা থেকে শুধুমাত্র ফকীর, গরীবেরা খাবে, কোন ধনী যেন না খায়। যখন এ ঘােষণা দেয়া হল তখন ধনীরা অসন্তুষ্ট হল আর বলল, এটা শুধু জাদু! এসব অস্বীকারকারীরা ৩০০ জন ছিল। এসব লােকেরা রাতে নিজের সন্তান সন্ততিসহ ভালভাবে ঘুমাল কিন্তু সকালে যখন উঠল তখন শুকর হয়ে গিয়েছিল।
রাসুলুল্লাহ্ ﷺ ইরশাদ করেছেন: "প্রতিটি উদ্দেশ্য সম্বলিত কাজ, যা দরূদ শরীফ ও যিকির ছাড়াই আরম্ভ করা হয়, তা বরকত ও মঙ্গল শূণ্য হয়ে থাকে।” (মাতালিউল মুসাররাত)
রাস্তায় এদিক-সেদিক দৌড়াচ্ছিল, ময়লা, পায়খানা খাচ্ছিল। যখন লােকেরা তাদের এ অবস্থা দেখল তখন হযরত সায়্যিদুনা ঈসা রূহুল্লাহ্ عَلى نَبِيِّنَا وَعَلَيهِ الصَّلٰوةُ وَالسَّلَام এর কাছে গেল। অনেক কান্নাকাটি করল। এ শুকরগুলােও তাঁর চতুর্পাশ্বে একত্রিত হল আর কাঁদতে লাগল। হযরত সায়্যিদুনা ঈসা রূহুল্লাহ্ عَلى نَبِيِّنَا وَعَلَيهِ الصَّلٰوةُ وَالسَّلَام তাদেরকে নাম ধরে ডাকতেন আর তারা জবাবে মাথা নাড়ত কিন্তু কথা বলতে পারত না। তিনদিন পর্যন্ত সীমাহীন অপমান নিয়ে বেঁচে রইল। চতুর্থদিন সবাই ধ্বংস হয়ে গেল। এদের মধ্যে কোন বাচ্চা ও মহিলা ছিল না সবাই পুরুষ ছিল। যত জাতিকে দুনিয়াতে বিকৃত করা হয়েছে তারা ধ্বংস হয়ে গেছে, তাদের বংশ পরম্পরা অগ্রসর হয়নি, এটা কুদরতের কানুন। (তফসীরে কবীর, ৪র্থ খন্ড, ৪৬৩ পৃষ্ঠা থেকে সংকলিত) তিরমিযী শরীফের হাদীসে রয়েছে: মদীনার তাজেদার, নবীকুল সরদার, হুযুরে আনওয়ার صَلَّى اللّٰهُ تَعَالَىٰ عَليهِ وَسَلَّم ইরশাদ করেছেন: “আসমান থেকে রুটি ও মাংসের দস্তরখানা অবতীর্ণ করা হল আর নির্দেশ দেয়া গেল, খিয়ানত করবে না, পরবর্তী দিনের জন্য সঞ্চয় করে রাখবে না। কিন্তু তারা খিয়ানত করল, আর পরবর্তী দিনের জন্য জমাও করল, তাই তাদেরকে বানর ও শুকরের আকৃতি করে দেয়া হল।” (জামি তিরমিযী, ৫ম খন্ড, ৪৪ পৃষ্ঠা, হাদীস নং- ৩০৭২) তাদেরকে তাগিদ করা হয়েছিল যে, এ দস্তরখানা থেকে পরবর্তী দিনের জন্য সঞ্চয় করে লুকিয়ে রাখবে না। কিছু লােক পরবর্তী দিনের জন্য সঞ্চয় করলে তাদেরকে শুকর বানিয়ে দেয়া হয়। হযরত সায়্যিদুনা আবদুল্লাহ্ বিন আমর رضى الله تعالى عنه ইরশাদ করেছেন: দস্তরখানা ওয়ালা ঈসায়ী, ফিরআউনী লােক ও মুনাফিকদের কিয়ামতের দিন কঠিন আযাব হবে। (আদ দুররুল মনসূর, ৩য় খন্ড, ২৩৭ পৃষ্ঠা)
শুয়ােরের নাম নিলে কি ওযু ভেঙ্গে যায়?
প্রিয় ইসলামী ভাইয়েরা! হযরত সায়্যিদুনা ঈসা রূহুল্লাহ্ عَلى نَبِيِّنَا وَعَلَيهِ الصَّلٰوةُ وَالسَّلَام এর মর্যাদা শান আপনারা দেখলেনতাে! তাঁর দোয়ায় আল্লাহ্ নেয়ামতপূর্ণ দস্তরখানা অবতীর্ণ করে দিলেন। দুনিয়াতে যাই নেয়ামত পাওয়া যায় সাধারণত এগুলাের মাঝে কষ্টও থাকে।
রাসুলুল্লাহ্ ﷺ ইরশাদ করেছেন: “যে ব্যক্তি আমার উপর সারাদিনে ৫০ বার দরূদ শরীফ পড়ে, আমি কিয়ামতের দিন তার সাথে মুসাফাহা করব।” (আল কওলুল বদী)
নেয়ামতের শােকর আদায়কারী তারা সফলকাম ও নেয়ামতের (খাবার) অস্বীকারকারীরা অকৃতকার্য হয়ে যায়। নেয়ামতের আধিক্য দেখে নাফরমানীতে লিপ্ত হওয়া ব্যক্তিদের কর্মের পরিণতি অপমান ও অপদস্ততা হয়ে থাকে। যেমনটা এ কুরআনী ঘটনা থেকে জানা গেল, ৩০০ জন নাফরমান শুকরের আকৃতিতে বিকৃত হয়ে গেল। এবং তিনদিন পর্যন্ত এদিক-সেদিক ধাক্কা খেতে থাকে আর চতুর্থ দিন অপমান জনক অবস্থায় মৃত্যু মুখে পতিত হল। আমরা আল্লাহর ক্রোধ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। অনেকের এ ধারণা রয়েছে, “শুকরের নাম নেয়াতে মুখ অপবিত্র হয়ে যায় ও তাতে অযু ভেঙ্গে যায়! এটা একেবারে ভুল ধারণা। শুকর শব্দ কুরআনে করীমেও বিদ্যমান রয়েছে। সুতরাং এ শব্দ মুখে নেয়াতে মুখ অপবিত্র হয় না এবং অযুও ভেঙ্গে যায় না।”
_______________
কিতাব : ফয়যানে সুন্নাত
লেখক : আমীরে আহলে সুন্নাত মাওলানা মুহাম্মদ বিলাল মুহাম্মদ ইলইয়াস আত্তার কাদেরী রযবীয়া (দা.)
সূত্রঃ 🌍 ইসলামী বিশ্বকোষ এপ্স।
https://play.google.com/store/apps/details?id=com.islamboi.rizwan
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন