একটি আপত্তি ও তার জবাব
ওপরে উদ্ধৃত (আবূ লাহাবের) বিবরণের ব্যাপারে কিছু লোক আপত্তি উত্থাপন করে বলে যে এ ঘটনা স্বপ্নে ঘটেছিলো, আর ওই স্বপ্ন দেখার সময় হযরত আব্বাস (رضي الله عنه) (তখনো) ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেননি; অতএব, এটা ইসলামী শরীয়তে কেন বৈধতার ভিত্তি পাবে? এই আপত্তির জবাব নিম্নরূপ:
প্রথমতঃ আমরা যখন মওলিদুন্নবী (ﷺ) উদযাপনের পক্ষে এই ঘটনাকে প্রামাণ্য দলিল হিসেবে গ্রহণ করি, তখন আমরা আবূ লাহাবের বক্তব্যকে আমাদের (বক্তব্যের) ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করি না, বরং আমাদের ভিত্তি হচ্ছে হযরত আব্বাস (رضي الله عنه)-এর কথা বা বাণী।
দ্বিতীয়তঃ যদিও হযরত আব্বাস (رضي الله عنه)-এর ইসলাম ধর্ম গ্রহণের আগে এই ঘটনাটি ঘটেছিলো, তবুও এটাকে প্রামাণ্য দলিল হিসেবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা-ই নেই। কেননা হযরত আব্বাস (رضي الله عنه) যখন এ ঘটনা বর্ণনা করেন, তখন তিনি মুসলমান হয়ে গিয়েছিলেন, আর এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত-ই নেই। তিনি এটা মহানবী (ﷺ)-এর একজন সাহাবী বা সাথী হিসেবেই বর্ণনা করেন। সুতরাং এই রওয়ায়াত তথা বর্ণনার ওপর নির্ভর করা যায়।
এবং সর্বোপরি, ইমাম বুখারী’র (১৯৪-২৫৬ হিজরী) মতো (উচ্চপর্যায়ের) মুহাদ্দীস-আলেম তাঁর ‘আল-সহীহ’ গ্রন্থে এই বর্ণনাকে উদ্ধৃত করার দরুন এর চেয়ে উত্তম কর্তৃত্বসম্পন্ন ও গ্রহণযোগ্য প্রামাণ্য দলিল আর কী-ই বা হতে পারে? ইমাম বুখারী (رحمة الله)-এর মতানুসারে যদি এই রওয়ায়াত নির্ভরযোগ্য না হতো, তাহলে কেন তিনি এটাকে তাঁরই সহীহ হাদীসের সংকলনে অন্তর্ভুক্ত করলেন? তিনি তো সরাসরি তা নাকচ করে দিতে পারতেন।
ইমাম বুখারী (رحمة الله) ছাড়াও তাঁর শিক্ষক ইমাম আবদুর রাযযাক্ব বিন হাম্মা’ম আল-সান’আনী (১২৬-২১১ হিজরী) এই রওয়ায়াত উদ্ধৃত করেন। ইমাম মারওয়াযী (২০২-২৯৪ হিজরী) ‘আল-সুন্নাহ’ গ্রন্থে এটা বর্ণনা করেন; ইমাম বায়হাক্বী (৩৮৪-৪৫৮ হিজরী) তাঁর তিনটি সংকলনে এটা বর্ণনা করেন: (ক) ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, (খ) ’শু’আব আল-ঈমান’ ও (গ) ‘দালায়েল আল-নুবুওয়্যা ওয়া মা’রেফা আহওয়াল সা’হেব আল-শরীআ’; ইবনে কাসীর (৭০১-৭৭৪ হিজরী) এটাকে নিজ ‘আল-বেদায়া ওয়াল-নেহায়া’ গ্রন্থে উদ্ধৃত করে; ইবনে সা’আদ (১৬৮-২৩০ হিজরী) ‘আল-তাবাক্বাত আল-কুবরা’ পুস্তকে এটা বর্ণনা করেন; ইমাম আল-বাগাভী (৪৩৬-৫১২ হিজরী) এই বর্ণনা তাঁর ‘শরহে আল-সুন্নাহ’ কেতাবে উদ্ধৃত করেন; ইবনে জাওযী (৫১০-৫৭৯ হিজরী) নিজ ‘সাফওয়া আল-সাফওয়া’ পুস্তকে এর উল্লেখ করেন; আল-সুহায়লী (৫০৮-৫৮১ হিজরী) ‘আল-রওদ আল-উনুফ ফী তাফসীর আল-সীরা’হ আল-নববীয়্যা লি ইবনে হিশা’ম’ গ্রন্থে এটা বর্ণনা করেন; এবং ইবনে আসা’কির (৪৯৯-৫৭১ হিজরী) ‘তা’রীখ দিমাশক্ব আল-কবীর’ কিতাবে এর উল্লেখ করেন।
এই বর্ণনা যদি সহীহ তথা বিশুদ্ধ/নির্ভরযোগ্য না হতো, আর মহানবী (ﷺ)-এর পবিত্র বেলাদত/ধরাধামে শুভাগমন উপলক্ষে আবূ লাহাবের প্রকাশিত খুশির কারণে তার (পারলৌকিক) শাস্তি লাঘব না হতো, তাহলে উপরোল্লিখিত উলামামণ্ডলী ও ধর্মীয় কর্তৃত্বসম্পন্ন ব্যক্তিবৃন্দ তাঁদের বইপত্রে (কখনোই) এটা বর্ণনা করতেন না। ইসলামী জ্ঞান বিশারদবৃন্দ শুধু এই রওয়ায়াত গ্রহণ-ই করেননি, বরং তাঁরা এর জ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ পেশ করে এর ওপর নির্ভর-ও করেছিলেন, যা আর বিস্তারিত আলোচনার অবকাশ রাখে না।
মোদ্দা কথা হলো, আমাদের দৃষ্টিতে এই বর্ণনা যে হযরত আব্বাস (رضي الله عنه) প্রদান করেছেন এবং ইমাম বুখারী (رحمة الله) তা লিপিবদ্ধ করেছেন আর অনেক মুহাদ্দীস-আলেম গ্রহণ করে নিয়েছেন, এটাই এর বিশুদ্ধতার ও নির্ভরযোগ্যতার প্রামাণ্য দলিল হওয়ার জন্যে যথেষ্ট। এ থেকে মওলিদুন্নবী (ﷺ) উদযাপনের বৈধতা প্রমাণিত হয়।
একটি সতর্কতামূলক উপদেশ
ওপরে উল্লেখিত (আবূ লাহাবের) ঘটনা হতে বাস্তবতা যা বেরিয়ে এসেছে তা হলো, কোনো কর্ম (তা এক মিনিটের জন্যে হলেও) যদি প্রিয়নবী (ﷺ)-এর খাতিরে করা হয়, তাহলে তা আল্লাহ পাকের দৃষ্টিতে উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন – এমন কি যদি তা কোনো অবিশ্বাসী দ্বারাও সংঘটিত হয়ে থাকে। অপর দিকে, ঈমানদারবৃন্দকে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে এই মর্মে যে, এমন কি তাঁরা যদি সারা জীবন নেক তথা পুণ্যদায়ক আমল/কর্ম সম্পন্ন করেও থাকেন অথচ মহাসম্মানিত রাসূল (ﷺ)-এর শানে সামান্যতম অশ্রদ্ধা প্রদর্শন বা বেয়াদবি করেন, তাহলে তাঁদের সমস্ত নেক-কর্ম শূন্যে পরিণত হবে। আল্লাহতা’লা এরশাদ ফরমান:
“হে ঈমানদারবর্গ! নিজেদের কণ্ঠস্বরকে উঁচু করো না ওই অদৃশ্যের সংবাদদাতা (নবী)-এর কণ্ঠস্বরের ওপর এবং তাঁর সামনে চিৎকার করে কথা বলো না যেভাবে পরস্পরের মধ্যে একে অপরের সামনে চিৎকার করো” [আল-ক্বুরআন, ৪৯:২]।
এই আয়াতে করীমায় আসহাব-এ-কেরাম (رضي الله عنه)-বৃন্দকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যেনো তাঁরা তাঁদের গলার স্বরকে নিচু রাখেন; আর একে অপরের সাথে তাঁরা যখন কথা বলেন, তখন যেনো তাঁদের কণ্ঠস্বর মহাসম্মানিত নবী (ﷺ)-এর মধুর কণ্ঠস্বরের চেয়ে উচ্চ আওয়াজের না হয়। মহাপরাক্রমশালী আল্লাহতা’লা-ই এখানে মহৎ সাহাবা-এ-কেরাম (ﷺ)-কে তাঁর মাহবূব তথা প্রেমাস্পদের (ﷺ) প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা শিক্ষা দিচ্ছেন। আয়াতটি আরো ব্যক্ত করে যে, কেউ হুযূরে পূর নূর (ﷺ)-এর প্রতি নিজ আচরণে সতর্ক না হলে তার নিম্নের সতর্কবাণী মনে রাখা বাঞ্ছনীয়:
“যেনো কখনো তোমাদের কর্মসমূহ নিষ্ফল না হয়ে যায় আর তোমাদের (সে ব্যাপারে) খবর-ও থাকবে না।” [আল-ক্বুরআন, ৪৯:২]
এখানে সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লার একত্ব যেমন প্রত্যাখ্যাত হয়নি, তেমনি হয়নি মহানবী (ﷺ)-এর সুন্নাহ-ও। আখেরাত, নামায, রোযা, দান-সদকাহ কিংবা হজ্জ্ব হতেও ঘটেনি বিচ্যুতি। এই সতর্কবাণী স্রেফ মহাসম্মানিত রাসূল (ﷺ)-এর পবিত্র কণ্ঠস্বর হতে কারোর নিজ গলার স্বর উঁচু করার একটিমাত্র (বেয়াদবিমূলক) কাজের বিরুদ্ধে উচ্চারিত হয়েছে। প্রিয়নবী (ﷺ)-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শনে ঘাটতি থাকলে কারো নেক আমল বরবাদ হয়ে যাবে।
এই আলোচনার আলোকে এটা জ্ঞাত হওয়া উচিত যে, একদিকে লক্ষ লক্ষ নেক আমল থাকা সত্ত্বেও অপর দিকে যদি সর্বাধিক সম্মানিত নবী করীম (ﷺ)-এর প্রতি ন্যূনতম পরিমাণ বেয়াদবিমূলক কাজ-ও সংঘটিত হয়, তবে আখেরাতের জীবনে ওই গোস্তাখ ব্যক্তি সমস্ত নেক আমলের পুরস্কার হতে বঞ্চিত হবে। পক্ষান্তরে, ইসলামের শত্রু ও আল্লাহর একত্ব অস্বীকারকারী কোনো অবিশ্বাসী সবচেয়ে মর্যাদাবান রাসূল (ﷺ)-এর আশীর্বাদপূর্ণ বেলাদত তথা ধরণীতলে শুভাগমনের সম্মানে স্রেফ একটি কর্ম সংঘটন করলে তাকে এই কাজের জন্যে আত্মার পাপমোচনমূলক জগতে এবং আখেরাতে পুরস্কৃত করা হবে। মওলানা আহমদ রেযা খাঁন সাহেব বলেন:
“একথা প্রতিষ্ঠিত যে সকল ফরয-কর্তব্য (মূলের) অনুষঙ্গ,
সব মূলের মূল মহানবী (ﷺ)-এরই প্রতি গোলামিপূর্ণ সঙ্গ।” (ভাবানুবাদ) [’হাদায়েক্বে বখশিশ’, ১:১৩৫]
কোনো মুসলমান-ব্যক্তির রেয়াযত-সাধনার শ্রেষ্ঠত্ব ও গ্রহণযোগ্যতা প্রিয়নবী (ﷺ)-এর প্রতি এশক্ব-মহব্বতের ওপরই ভিত্তিশীল। তাঁর প্রতি অন্তরে কোনো ভালোবাসা না থাকলে সমস্ত নেক আমল পুরস্কারের অযোগ্য বলে আল্লাহতা’লার কাছে বিবেচিত হবে। এই কারণেই আশেক্ব-ভক্ত পুণ্যাত্মাবৃন্দ প্রিয়নবী (ﷺ)-এর পবিত্র দরবারে নিজেদের আর্জি পেশ করেন এই বলে:
“হে মহত্ত্বের প্রতীক, আপনার বদান্যতা এতো বিশাল,
কেউই তৃষ্ণার্ত রয় না হতে আপনার দরাজদিল,
আপনার আশীর্বাদপূর্ণ নজর হতে কীভাবে আশেক্ব রয় বঞ্চিত,
যবে এমন কি শত্রুকেও আপনি রাখেন না গরিবিতে অধঃপতিত।” (ভাবানুবাদ) [শায়খ সা’দী, গুলিস্তাঁ, ৬৬ পৃষ্ঠা]
এই অধ্যায় হতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে মওলিদুন্নবী (ﷺ)-এর উদযাপন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর বাণী ও কর্ম দ্বারা সুপ্রতিষ্ঠিত। তাঁর বেলাদত তথা ধরাধামে শুভাগমনকে স্মরণ করা শরীয়ত-বিরোধী কোনো বিষয় নয়; বরঞ্চ তা সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা ও তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর নির্দেশের সাথে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ বিষয়। বস্তুতঃ এটা ইসলাম ধর্মের একটি আবশ্যিক শর্ত। এর আশীর্বাদ হতে এমন কি অবিশ্ববাসীরাও বঞ্চিত নয়। অতএব, মহানবী (ﷺ)-এর বেলাদত উপলক্ষে উম্মতের কোনো পাপী সদস্য যদি খুশি প্রকাশ করেন, তাহলে কীভাবে এটা হতে পারে যে ওই কাজের জন্যে আল্লাহতা’লা তাঁকে পুরস্কৃত করবেন না?
__________________
মওলিদুন্নবী (ﷺ)-এর উদযাপন ও অনুমতি (১ম খণ্ড)
মূল: শায়খুল ইসলাম ড: মুহাম্মদ তাহিরুল কাদেরী
অনুবাদ: কাজী সাইফুদ্দীন হোসেন
🌍 ইসলামী বিশ্বকোষ এপ্স।
https://play.google.com/store/apps/details?id=com.islamboi.rizwan]
إرسال تعليق