মওলিদুন্নবী (ﷺ) উদযাপনের ব্যাপারে মুহাদ্দেসীন-এ-কেরাম ও ইমামবৃন্দের দৃষ্টিভঙ্গি (৩)


মওলিদুন্নবী (ﷺ) উদযাপনের ব্যাপারে মুহাদ্দেসীন-এ-কেরাম ও ইমামবৃন্দের দৃষ্টিভঙ্গি (৩)


মওলিদুন্নবী (ﷺ) উদযাপনের পক্ষে ক্বুরআন-সুন্নাহভিত্তিক বিস্তারিত প্রামাণ্য দলিলাদি পেশের পর এই অধ্যায়ে আমরা এতদসংক্রান্ত বিষয়ের সমর্থনে মতামত প্রকাশকারী ইমামবৃন্দের দলিলগুলো উপস্থাপন করবো। বিভিন্ন ইসলামী দেশ ও সময়কালের সাথে সম্পৃক্ত তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি এক্ষেত্রে ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বর্ণনা করা হবে।

মীলাদের এই অনুশীলিত প্রথা ইসলাম ধর্মের মধ্যে সাম্প্রতিক সংযোজন (বেদআত) কিংবা এধরনের রীতি ভারত উপমহাদেশীয় মুসলমানদের দ্বারা-ই কেবল প্রবর্তিত বলাটা একেবারেই ভুল এবং তা বাস্তবতারও পরিপন্থী। বাস্তবতা হলো, মওলিদুন্নবী (ﷺ) স্রেফ পাকিস্তান বা ভারতের মুসলমানদের অনুশীলিত রীতি নয়, কিংবা এটা বেদআত-ও নয়। সমসাময়িককালের মুসলমান সমাজ এই প্রথার প্রবর্তক নন। বস্তুতঃ মওলিদুন্নবী (ﷺ) এমন একটি আনন্দঘন ধর্মীয় অনুষ্ঠান যা দুটি পবিত্র স্থান মক্কা মোয়াযযমা ও মদীনা মোনাওয়ারা এবং গোটা আরব জাহান শতাব্দীর পর শতাব্দী যাবত পালন করে আসছে। ইসলামী বিশ্বের অনারব অংশে এই প্রথা পরবর্তীকালে চালু হয়।

মওলিদুন্নবী (ﷺ) উদযাপনের পক্ষে নেতৃস্থানীয় ইমামমণ্ডলী ও হাদীসবেত্তাবৃন্দের অভিমত ও শরঈ সিদ্ধান্ত নিচে দেয়া হলো:



১১. ইমাম শামস আল-দীন আল-যাহাবী (৬৭৩-৭৪৮ হিজরী)   

ইমাম শামস আল-দ্বীন আবূ আবদিল্লাহ মুহাম্মদ বিন আহমদ বিন উসমা’ন আল-যাহাবী (১২৭৪-১৩৪৮ খৃষ্টাব্দ) মুসলিম জাহানের সেরা ইতিহাসবিদ ও মুহাদ্দীস উলামাদের একজন হিসেবে প্রশংসিত। তিনি ‘তাজরীদ আল-উসূল ফী আহা’দীসির রাসূল’, ‘মীযা’ন আল-এ’তেদা’ল ফী নাক্বদ আল-রিজা’ল, ‘আল-মুশতাবা ফী আসমা’ আল-রিজা’ল’, ‘তাবাক্বা’ত আল-হুফফা’য’ ইত্যাদির মতো বেশ কিছু সংখ্যক বই সংকলন করে হাদীস-শাস্ত্রের মৌলনীতি (উসূলে হাদীস) ও ‘এলম আল-রিজা’ল’ তথা জীবনী মূল্যায়ন বিদ্যার ক্ষেত্রে বড় অবদান রেখেছেন। তাঁর লেখা জনপ্রিয় ইতিহাসগ্রন্থ হচ্ছে ’তা’রীখ আল-ইসলাম ওয়া ওয়াফিয়্যা’ত আল-মাশা’হীর ওয়াল-আ’লাম’। ‘এলম আল-রিজা’ল’শাস্ত্রে তাঁর লেখা ‘সিয়্যার আ’লাম আল-নুবালা’ একটি চমৎকার বই, যা’তে লেখক হাদীসের রাবী তথা বর্ণনাকারীদের জীবনীর পরিপ্রেক্ষিত/পটভূমি তুলে ধরেছেন; এই বইটি পণ্ডিতদের মাঝে এক বিশেষ আসন অধিকার করে আছে।

ইমাম যাহাবী তাঁর লেখনীতে সুলতান সালা’হ আল-দ্বীন আল-আইয়ূবী’র ভগ্নিপতি ইরবিল রাজ্যের সুলতান মুযাফফার আল-দ্বীন আবূ সাঈদ আল-কাওকাবুরী (বেসাল: ৬৩০ হিজরী) সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশংসাসূচক বর্ণনা প্রদান করেন। বাদশাহ আল-কাওকাবুরী ছিলেন এক অতিশয় উদার ও অতিথিপরায়ণ ব্যক্তি যিনি মরণ-ব্যাধিগ্রস্ত ও অন্ধদের জন্যে চারটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন; আর সেগুলো তিনি প্রতি সোমবার ও বৃহষ্পতিবার পরিদর্শন করতে যেতেন। তিনি অভিভাবকহীন বিধবা নারী, এতিম-অনাথ ও শিশুদের জন্যেও গৃহ নির্মাণ করে দেন, আর তিনি নিয়মিতভাবে অসুস্থদের দেখতে যেতেন। সুলতান কাওকাবুরী হানাফী ও শাফেঈ মযহাবের শিক্ষার্থীদের জন্যে আলাদা আলাদা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা বিদ্যায়তন প্রতিষ্ঠা করেন এবং সুফীদের জন্যে বসবাসের আস্তানা/খানেগাহ গড়ে দেন। ইমাম যাহাবী লেখেন যে এই সুলতান আক্বীদা-বিশ্বাসে সুন্নী মুসলমান ছিলেন, আর নির্মল আত্মাবিশিষ্ট এবং ধার্মিক-ও ছিলেন। ইমাম সাহেব নিজের ‘সিয়্যার আ’লাম আল-নুবালা’ এবং ‘তা’রীখ আল-ইসলাম ওয়া ওয়াফিয়্যা’ত আল-মাশা’হীর ওয়াল-আ’লাম’ উভয় পুস্তকেই এর বিস্তারিত বিবরণ প্রদান করেন।

সুলতান কাওকাবুরী কর্তৃক মওলিদুন্নবী (ﷺ) উদযাপন সম্পর্কে ইমাম যাহাবী তাঁর বিবরণে বলেন: “সুলতানের মওলিদ উদযাপন মুখে বর্ণনারও অতীত! ইরাক্ব ও আরব উপদ্বীপ (জাযিরাতুল আরব) হতে মানুষেরা তাঁর উৎসব আয়োজনে শরীক হবার জন্যে যাত্রা করতেন….তিনি বিশাল সংখ্যক গরু, উট ও ভেড়া/ছাগল/দুম্বা (এই উদ্দেশ্যে) ক্বুরবানী করতেন এবং বিভিন্ন ধরনের রান্নার আয়োজন করতেন। সুফী/দরবেশমণ্ডলীকে উঁচু মর্যাদার ভূষণ দ্বারা সম্মানিত করতেন। শহরের প্রধান চত্বরে ওয়ায়েযীনবৃন্দকে শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে বয়ান রাখার সুযোগ দেয়া হতো, আর সুলতান (এসব আয়োজনে) বিপুল পরিমাণ অর্থব্যয় করতেন। মহানবী (ﷺ)-এর পবিত্র মীলাদ সম্পর্কে ইবনে দিহইয়া একখানি বই লিখেন, যার পুরস্কারস্বরূপ সুলতান তাঁকে এক সহস্র দিনার এনাম দেন। সুলতান মুযাফফার শাহ ছিলেন বিনয়ী ও প্রকৃত সুন্নী মুসলমান যিনি গরিব মানুষ ও মুহাদ্দীসীনবৃন্দকে মহব্বত করতেন। সিবত্ আল-জাওযী বলেন, ‘মওলিদ উদযাপন বাবদ সুলতান মুযাফফার শাহের বাৎসরিক ব্যয় হতো তিন লক্ষ দিনার; আর তিনি দুই লক্ষ দিনার খরচ করতেন সুফীদের জন্যে খানেগাহ/আস্তানা নির্মাণ বাবদ….আল-মুযাফফার শাহের আয়োজিত মওলিদ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী জনৈক ব্যক্তি উল্লেখ করেন যে রাজকীয় দস্তরখানে এক লক্ষ মাটির গেলাস/পানপাত্র, পাঁচ হাজার ছাগলের মাথা, দশ হাজার মোরগ, এক লক্ষ প্লেটভর্তি শুকনো ফল ও ত্রিশ হাজার প্লেটভর্তি মিষ্টি পরিবেশিত হতো….’।” [আল-যাহাবী, ‘সিয়্যার আ’লা’ম আল-নুবালা’, ১৬:২৭৪-২৭৫; আল-যাহাবী, ‘তা’রীখ আল-ইসলাম ওয়া ওয়াফায়্যাত আল-মাশা’হীর ওয়াল-আ’লা’ম’ (৬২১-৬৩০ হিজরী), ৪৫:৪০২-৪০৫]।


  ইমাম কামাল আল-দীন আল-আদফাউয়ী (৬৮৫-৭৪৮ হিজরী)

ইমাম কামা’ল আল-দ্বীন আবূ আল-ফাদল জা’ফার বিন সা’লাব বিন জা’ফার আল-আদফাউয়ী (১২৮৬-১৩৪৭ খৃষ্টাব্দ) নিজের লেখা ‘আল-তা’লী’ আল-সাঈদ আল-জা’মী’ লি-আসমা’ নুজাবা’ আল-সাঈদ’ পুস্তকে লেখেন: “আমাদের বিশ্বস্ত বন্ধু না’সির আল-দ্বীন মাহমূদ বিন আল-’এমা’দ আমাদেরকে জানান যে আবূ আল-তাইয়্যাব মুহাম্মদ বিন ইবরা’হীম আল-সাবতী আল-মা’লেকী যিনি ফূস্ নগরীর অধিবাসী ও অন্যতম নেককার আলেম, তিনি মকতব (বিদ্যালয়) অতিক্রমের সময় বলতেন, ‘ওহে আলেম! আজ খুশির দিন; শিশুদের বেরোতে দাও।’ এমতাবস্থায় তাঁকে (না’সিরুদ্দীন ’এমা’দকে) বেরোতে দেয়া হতো।”

এটা তাঁর কাছ থেকে (অকাট্য) প্রমাণ যে তিনি মওলিদ উদযাপনকে গ্রহণ করতেন এবং এর সমালোচনা করতেন না; আর তিনি ছিলেন বিভিন্ন বিদ্যাশাস্ত্রে পারদর্শী মালেকী মযহাবের ফক্বীহ ও নীতিপরায়ণ ব্যক্তি। (পণ্ডিত) আবূ হাইয়্যান ও অন্যান্যরা তাঁর কাছে শিক্ষাগ্রহণ করেন। ৬৯৫ হিজরী সালে তিনি বেসালপ্রাপ্ত হন। [আল-সৈয়ূতী, ‘হুসন আল-মাক্বসিদ ফী ’আমল আল-মওলিদ’, ৬৬-৬৭ পৃষ্ঠা; আল-সৈয়ূতী, ‘আল-হা’ওয়ী লিল-ফাতা’ওয়া’, ২০৬ পৃষ্ঠা; আল-নাবহা’নী, ‘হুজ্জাত-আল্লাহ ’আলা’ল-’আলামীন ফী মু’জেযা’ত-এ-সাইয়্যেদিল-মুরসালীন’, ২৩৮ পৃষ্ঠা]।




১৩. তকী আল-দীন আবূ আল-হাসান আল-সুবকী (৬৮৩-৭৫৬ হিজরী)

ইমাম তক্বী আল-দ্বীন আবূ আল-হাসান ‘আলী বিন ‘আবদ্ আল-কা’ফী আল-সুবকী (১২৮৪-১৩৫৫ খৃষ্টাব্দ) সম্পর্কে শায়খ ইসমাঈল হাক্কী (১০৬৩-১১৩৭ হিজরী) নিম্নের বক্তব্য পেশ করেন: “ইমাম তক্বীউদ্দীন সুবকী (رحمة الله)-এর সমসাময়িক উলামাবৃন্দের একটি বড় দল তাঁরই সদরতে (পরিচালনায়) সমবেত হতেন (মীলাদের মজলিশে)। আল-সারসারী আল-হাম্বলী (رحمة الله)-এর রচিত মহানবী (ﷺ)-এর প্রশংসাসূচক কবিতা কোনো আবৃত্তিকার পাঠ করে শোনাতেন:

“আল-মুস্তাফা (ﷺ)-এর প্রশংসায় অপর্যাপ্ত,

স্বর্ণ যা সুন্দরতম লিপিবিদ্যায় কাগজে অঙ্কিত,

গণ্যমান্য সবাই তাঁর কথা হলে শ্রুত,

তাঁর প্রতি অভিবাদন করেন ব্যক্ত,

হয়ে সারিবদ্ধ বা হাঁটু গেড়ে, অবনত।” (ভাবানুবাদ) [ইসমাঈল হাক্কী কৃত ‘তাফসীরে রূহুল বয়া’ন’, ৯:৫৬; এবং আল-হালাবী প্রণীত ‘ইনসান আল-’উয়ূন ফী সীরাতিল-আমীন আল-মা’মূন’, ১:৮৪]।



১৪. ’ইমাদ আল-দীন বিন কাসীর (৭০১-৭৭৪ হিজরী)

আল-হাফেয ‘ইমাদ আল-দ্বীন আবূ আল-ফিদা’ ইসমাঈল বিন কাসীর (১৩০১-১৩৭৩ খৃষ্টাব্দ) প্রসিদ্ধ ক্বুরআন-এ-করীমের ব্যাখ্যাকারী (মুফাসসির), হাদীস-শাস্ত্রজ্ঞ (মুহাদ্দীস), ইতিহাসবিদ ও ফক্বীহ (ইসলামী বিধানশাস্ত্রজ্ঞ) ছিলেন। তার লেখা ‘তাফসীর আল-ক্বুরআন আল-’আযীম’ শীর্ষক গ্রন্থটি ক্বুরআন-ব্যাখ্যাশাস্ত্রে অতীব পাণ্ডিত্যপূর্ণ। ‘জামেউ’ল-মাসা’নীদ ওয়াল-সুনান’ শীর্ষক পুস্তকে তিনি বিপুল পরিমাণ হাদীস শরীফ নক্বল করেন। ইতিহাসের বিদ্যায় তার লেখা ‘আল-বেদা’য়া ওয়ান-নেহা’য়া’বইটি বিখ্যাত ও চমৎকার। এই বইটিতে তিনি ইরবিলের রাজা আবূ সাঈদ মোযাফফার আল-দ্বীন শাহের মওলিদ-উৎসব উদযাপনের বিস্তারিত এক বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন। এছাড়াও ইবনে কাসীর একটি পুস্তিকা রচনা করেন যার শিরোনাম ‘যিকরে মওলিদে রাসূলিল্লাহে ওয়া রাদা’ইহী’। ইবনে কাসীর লেখেন:

“মহানবী (ﷺ)-এর সেবাযত্ন প্রথম যে মহিলা করেন, তিনি (হুযূরের চাচা) আবূ লাহাবের মুক্তিপ্রাপ্তা দাসী সোয়াইবা। তিনি-ই আবূ লাহাবের কাছে রাসূল (ﷺ)-এর ধরাধামে শুভাগমনের সুসংবাদ নিয়ে এসেছিলেন, যার ফলশ্রুতিতে আবূ লাহাব খুশি হয়ে তাঁকে মুক্তি দিয়েছিলো। তার ভাই হযরত আব্বাস ইবনে আবদ্ আল-মুত্তালিব (رضي الله عنه) তার মৃত্যুর পর তাকে (স্বপ্নে) সঙ্কটাপন্ন দেখেতে পান; তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমার কী হয়েছে?’ আবূ লাহাব (এর উত্তরে) বলে, ‘আমি জাহান্নামের আগুনে আছি। তবে প্রতি সোমবারের রাতে আমার শাস্তি লাঘব করা হয় এবং আমি এ আঙ্গুলগুলোর ডগা হতে পানি পান করতে সক্ষম হই (সে তার তর্জনী ও মধ্যমা আঙ্গুল দুটো দেখিয়ে বলেছিলো এ কথা)। আর এটা সোয়াইবা’কে মুক্ত করার কারণেই হয়েছে, যখন-ই সে মহানবী (ﷺ)-এর মীলাদের খোশ-খবর আমার কাছে নিয়ে এসেছিলো।’ এই হাদীসের সূত্র সহীহাইন (বুখারী ও মুসলিম) গ্রন্থগুলোতে লিপিবদ্ধ রয়েছে।

“যেহেতু দাসত্ব থেকে মুক্ত করে দেয়া এই মহিলা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বুকের দুধ পান করিয়েছিলেন, সেহেতু ওই সেবার উপকার তাঁর চাচা আবূ লাহাবের কাছে প্রতিদান হিসেবে মঞ্জুর করা হয়েছিলো; আর তাই সে তেষ্টা মেটাতে সক্ষম হয়েছিলো এরই কারণে, যদিও আল্-ক্বুরআনের একটি গোটা সূরা তার প্রতি অভিশাপস্বরূপ অবতীর্ণ হয়েছিলো।



১৪.১ আবূ সাঈদ আল-মুযাফফর (সুলতান গাযী সালাহউদ্দীনের ভগ্নিপতি) কর্তৃক উদযাপিত মওলিদুন্নবী (ﷺ)

ক্রুসেড-বিজয়ী সুলতান সালা’হ আল-দ্বীন আল-আইয়ূবী’র (৫৩২-৫৮৯ হিজরী/১১৩৮-১১৯৩ খৃষ্টাব্দ) ভগ্নিপতি ছিলেন বাদশাহ আবূ সাঈদ অাল-মোযাফফর (ইন্তেক্বাল: ৬৩০ হিজরী)। সুলতানের আপন বোন রাবী’আ খা’তূন ছিলেন তাঁর স্ত্রী। সুলতান সালা’হ আল-দ্বীন বাদশাহকে খুব পছন্দ করতেন। এই দু জন নিজেদের অন্তরাত্মা দিয়ে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে দ্বীন-ইসলামের প্রভূত সেবা করেন। বাদশাহ মোযাফফর শাহ ধার্মিক, নেককার ও মহানুভব ছিলেন। বাদশাহ’র সুউচ্চ ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক হাল-অবস্থা এবং এর পাশাপাশি ইসলাম ধর্মের প্রতি তাঁর খেদমত দেখে সুলতান সালা’হ আল-দ্বীন তাঁর সাথে আপন বোনকে বিয়ে দেন।

সুলতান সালা’হ আল-দ্বীনের জবানিতে আবূ সাঈদ মোযাফফর শাহের বর্ণনা এভাবে দেয়ার পর ইবনে কাসীর বাদশাহের উন্নত বৈশিষ্ট্যগুলোর বিশদ ব্যাখ্যা দেয়ার জন্যে একটি প্যারাগ্রাফ লেখেন, যা’তে তিনি বাদশাহের জীবনী ও তাঁর অন্তরের সততা, ধার্মিকতা ও প্রকৃতি তুলে ধরেন। বাদশাহ কর্তৃক মওলিদুন্নবী (ﷺ) উদযাপনের একটি দীর্ঘ বিবরণ তিনি তাতে লিপিবদ্ধ করেন। এই পবিত্র দিন উপলক্ষে খুশি ও সুখ-শান্তি প্রকাশার্থে বাদশাহের প্রচেষ্টা ও উৎসাহ-উদ্দীপনার একটি চিত্র ইবনে কাসীর তুলে ধরেছেন। ইবনে কাসীর লেখেন:

বাদশাহ মোযাফফর শাহ: তাঁর নাম আবূ সাঈদ কাওকাবুরী বিন যাইন আল-’আবেদীন ‘আলী বিন বাকতগীন; তিনি মহানুভব ও জ্যেষ্ঠ বাদশাহদের একজন। তিনি অনেক ভালো কাজ রেখে গিয়েছেন এবং ক্বা’সইয়ূন পর্বতের ওপরে আল-মোজাফফর জামে’ মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। কোনো এক পর্যায়ে তিনি বারযা হতে পানি প্রণালী দ্বারা মসজিদকে সংযুক্ত করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আল-মু’আযযাম তাঁকে এথেকে নিবৃত্ত করেন; কেননা এটা পর্বত চূড়োয় অবস্থিত মুসলমানদের কবরস্থানের ওপর দিয়ে অতিক্রম করার সম্ভাবনা ছিলো।

পবিত্র রবীউল আউয়াল মাসে বাদশাহ মওলিদ অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন এবং তাতে মহা জাঁকজমকের সাথে অংশগ্রহণ করতেন। তিনি ছিলেন খালেস তথা একনিষ্ঠ অন্তরের, সাহসী, বুদ্ধিমান ও শিক্ষিত ব্যক্তি। আল্লাহ পাক যেনো তাঁর প্রতি আপন করুণা বর্ষণ করেন এবং আখেরাতে বা পরকালে তাঁকে রফে’ মানযিলাত (উচ্চ মর্যাদাপূর্ণ আবাসস্থল) মঞ্জুর করেন।

শায়খ আবূ আল-খাত্তা’ব বিন দিহইয়া বাদশাহের উদ্দেশ্যে একটি বই লিখেছিলেন, যেটা মহানবী (ﷺ)-এর মীলাদ তথা ধরাধামে শুভাগমন দিবস উদযাপন উপলক্ষে ব্যবহৃত হতো। এর শিরোনাম ছিলো ‘আল-তানউয়ীর ফী মওলিদিল-বাশীর আল-নাযীর’ (সুসংবাদদানকারী ও সতর্ককারীর ধরণীতলে শুভাগমনের রোশনাই)। মোযাফফর শাহ এই বইটির জন্যে ইবনে দিহইয়াকে এক সহস্র দিনার দান করেন। বাদশাহ (সিরিয়ার) সালা’হীয়্যা নগরীতে ক্ষমতাসীন ছিলেন, যতোদিন না আক্কা নগরী অবরুদ্ধ হয় এবং ক্রুসেডার গোষ্ঠীর অবরোধে আক্কায় তিনি ইন্তেক্বাল করেন (৬৩০ হিজরী); আর এই বইটি তাঁর সাথে ছিলো ওই পুরোটুকু সময়-ই। তিনি ছিলেন প্রশংসনীয় চরিত্র ও ধার্মিকতার অধিকারী।

সিবত ইবনে আল-জাওযী বলেন: “আল-মোযাফফর শাহের উদযাপিত মওলিদ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী জনৈক ব্যক্তি উল্লেখ করেন যে শাহী খাবার টেবিলে পাঁচ হাজার ছাগলের মাথা, দশ হাজার মোরগ, এক লাখ মাটির পাত্রভর্তি দুধ ও ত্রিশ হাজার প্লেটভর্তি মিষ্টি থাকতো।” [ইবনে কাসীর, ‘আল-বেদায়া ওয়ান-নেহায়া’, ৯:১৮; মুহিবী, ‘খুলাসা আল-আসার ফী আ’এয়া’ন আল-ক্বার্ন আল-হা’দী ‘আসহার’, ৩:২৩৩; আল-সৈয়ূতী, ‘হুসন আল-মাক্বসিদ ফী ‘আমলিল মওলিদ’, ৪২-৪৪ পৃষ্ঠা; আল-সৈয়ূতী, ‘আল-হা’উয়ী লিল-ফাতা’ওয়া’, ২০০ পৃষ্ঠা; আহমদ বিন যাইনী দাহলান, ‘আল-সীরাত আল-নববীয়্যা’, ১:৫৩-৫৪]      

এক্ষণে ইবনে কাসীরের নিম্নোক্ত বক্তব্যটি সম্পর্কে ভাবুন:

প্রখ্যাত উলামা-এ-হক্কানী/রব্বানী ও সূফীবৃন্দ এই মওলিদ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতেন; আর বাদশাহ মোযাফফার শাহ তাঁদেরকে রাজকীয় সম্মানসূচক জুব্বা উপহার দিতেন। তিনি সূফীদের সমাবেশে সেমা’ তথা আধ্যাত্মিক/মরমী/কাউয়ালী গানের মাহফিলসমূহ আয়োজন করতেন যা যোহরের নামাযের পর হতে আসরের নামাযের আগ পর্যন্ত চলতো; আর তিনিও সূফীমণ্ডলীর সাথে ওয়াজদ/রকস্ তথা (ঘুরে ঘুরে) দৈহিক স্পন্দন দ্বারা (ঐশী ভাবোন্মত্ততায়) আধ্যাত্মিকতার পরশ লাভ করতেন। বিভিন্ন রাজ্য হতে আগত প্রতিনিধি দলের জন্যে তিনি একটি মেহমানখানা (অতিথিশালা) রেখেছিলেন, আর নানা পেশার মানুষেরা বিভিন্ন এলাকা থেকে সেখানে আসতেন। তিনি উত্তম কাজে ও তা’আত তথা ধর্মীয় আনুগত্যমূলক কর্মে (প্রচুর) দান করতেন; এভাবে তিনি হারামাঈন শরীফাইন (মক্কা মোয়াযযমা ও মদীনা মোনাওয়ারা) ও অন্যান্য পবিত্র স্থানের জন্যে দান-সদকাহ করতেন এবং প্রতি বছর বিশাল সংখ্যক ‘ফারান্জ’ (খৃষ্টান ক্রুসেডার) বন্দিদের মুক্ত করে দিতেন। কথিত আছে যে তিনি সর্বমোট ষাট হাজার বন্দিকে মুক্ত করেন।

বাদশাহ’র স্ত্রী রাবী’আ খা’তূন বিনতে আইয়ূব (যাঁর ভাই সুলতান সালা’হ আল-দ্বীন আল-আইয়ূবী তাঁকে বাদশাহের সাথে আক্কা নগরীতে বিয়ে দিয়েছিলেন) বিবৃত করেন, “বাদশাহ’র আলখাল্লা পাঁচ দিরহামের বেশি দামি ছিলো না। আমি তাঁর জামাকাপড়ের পছন্দ নিয়ে সমালোচনা করলে তিনি আমায় বলেন, ‘আমার জামাতে পাঁচ দিরহাম ব্যয় করে বাকি অর্থ দান-সদকাহ করা আমার কাছে দামি কাপড় পরে দরিদ্র ও বঞ্চনায় ক্ষুব্ধ মানুষকে অবহেলা করার চেয়ে অধিক প্রিয়’।” মওলিদ বাবদ তাঁর বাৎসরিক ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াতো তিন লাখ দিনার, আর তিনি অতিথিশালার রক্ষণাবেক্ষণে প্রতি বছর ব্যয় করতেন দুই লাখ দিনার। পবিত্র হারামাঈন শরীফাইনের জন্যে এবং হেজায অঞ্চলে অবস্থিত সমস্ত পানি সেচ কেন্দ্রগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে তিনি বাৎসরিক আরো ব্যয় করতেন ত্রিশ হাজার দিনার। আমাদের লক্ষ্য করা উচিত যে এসব ব্যয়ের কোনোটাতেই মোযাফফার শাহের গোপন দান অন্তর্ভুক্ত ছিলো না। তিনি ইরবিলের দুর্গে ইন্তেক্বাল করেন এবং এই মর্মে অসীয়ত করে যান যেনো তাঁকে দাফনের জন্যে মক্কা মোয়াযযমায় নেয়া হয়; তবে তা সম্ভব না হওয়ায় মাশাদ ’আলী’তে তাঁকে দাফন করা হয়। [ইবনে কাসীর, ‘আল-বেদায়া ওয়ান্ নেহায়া’, ৯:১৮; আল-সৈয়ূতী, ‘হুসন আল-মাক্বসিদ ফী আমলিল-মওলিদ’, ৪৪ পৃষ্ঠা; আল-সৈয়ূতী, আল-হা’উয়ী লিল-ফাতা’ওয়া’, ২০০ পৃষ্ঠা; আল-সা’রেহী, ‘সুবুল আল-হুদা’ ওয়াল-রাশা’দ ফী সীরাতে খায়র আল-’এবা’দ’, ১:৩৬২-৩৬৩; এবং আল-নাবহা’নী, হুজ্জাতুল্লা’হি ‘আলা’ল ‘আলামীন ফী মো’জেযাতে সাইয়্যেদিল মুরসালীন’, ২৩৬ পৃষ্ঠা]    

মওলিদ অনুষ্ঠান উদযাপনে বাদশাহ তিন লাখ দিনার ব্যয় করতেন। স্পষ্টতঃ ইবনে কাসীর এই বিপুল ব্যয়কে অনুমোদন করেছিলেন। কেননা তিনি এর সমালোচনায় একটি শব্দ-ও উচ্চারণ করেননি। মনে রাখবেন যে (তখনকার) এক দিনার সমান বর্তমানের আনুমানিক দুই বৃটিশ পাউন্ড স্টারলিং; সে মোতাবেক মওলিদুন্নবী (ﷺ) উদযাপন উপলক্ষে ব্যয়িত অর্থের পরিমাণ ছয় লাখ বৃটিশ পাউন্ড স্টারলিং। অধিকন্তু, আমরা প্রায় ৮০০ বছর আগের প্রেক্ষাপটে ছয় লাখ বৃটিশ পাউন্ডের কথা বলছি। এই পরিমাণ অর্থ যদি বর্তমানের মানদণ্ডে আমাদেরকে তুলনা দিতে হতো, তাহলে এ কথা বলা যেতে পারতো যে এক দিনার সমান কম করে হলেও স্বর্ণের এক আউন্সের (প্রায় আধ ছটাকের) এক-চতুর্থাংশ (বা সিকি); এটা আমাদের সময়কার চার হাজার পাকিস্তানী রুপী হবে। অনুরূপভাবে, এক দিনার সমান বর্তমানের চল্লিশ বৃটিশ পাউন্ড স্টারলিং হবে। অতএব, চল্লিশ পাউন্ডকে তিন লক্ষ পাউন্ড দ্বারা গুণ দেয়া হলে তা বারো লক্ষ পাউন্ড স্টারলিংয়ের সমান হবে। তবে এটা স্রেফ একটা হিসেব মাত্র।



১৫. বুরহান আল-দীন বিন জামা’আ (৭২৫-৭৯০ হিজরী)

বুরহা’ন আল-দ্বীন আবূ এসহা’ক্ব ইবরা’হীম বিন আবদ আল-রাহীম বিন ইবরা’হীম বিন জামা’আ আল-শা’ফেঈ (১৩২৫-১৩৮৮ খৃষ্টাব্দ) ছিলেন একজন প্রসিদ্ধ বিচারক (কাজী) ও ক্বুরআন ব্যাখ্যাকারী (তাফসীরকার)। তিনি কিতা’বুল্লাহ শরীফের একটি দশ খণ্ডবিশিষ্ট তাফসীরগ্রন্থ লিখেছিলেন। মওলিদ সংক্রান্ত তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বর্ণনা করতে গিয়ে মোল্লা আলী ক্বারী (ইন্তেক্বাল: ১০১৪ হিজরী) নিজ ‘আল-মওরিদ আল-রাওয়ী ফী মওলিদিল নববী ওয়া নাসাবিহি আল-তা’হির’ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেন: আমাদের কাছে (এ তথ্য) এসেছে যে যুহদ তথা দুনিয়ার মোহত্যাগী ও পুণ্যবানের জ্বলন্ত নিদর্শন আবূ এসহাক্ব ইবরাহীম বিন আবদ আল-রাহীম বিন ইবরাহীম বিন জামা’আ (رحمة الله) যখন রাসূলে খোদা সল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের মদীনা নগরীতে অাগমন করতেন, তখন তিনি মওলিদ উদযাপন উপলক্ষে খাবার তৈরি করতেন এবং ঘোষণা করতেন, ‘আমার যদি সামর্থ্য থাকতো, তাহলে আমি মাসের প্রতিটি দিনই মওলিদ মাহফিলের আয়োজন করতাম।’ [মোল্লা আলী ক্বারী, ‘আল-মওরিদ আল-রাওয়ী ফী মওলিদিল নববী ওয়া নাসাবিহি আল-তা’হির’, ১৭ পৃষ্ঠা]।

__________________

মওলিদুন্নবী (ﷺ)-এর উদযাপন ও অনুমতি (১ম খণ্ড)

মূল: শায়খুল ইসলাম ড: মুহাম্মদ তাহিরুল কাদেরী

অনুবাদ: কাজী সাইফুদ্দীন হোসেন

 🌍 ইসলামী বিশ্বকোষ এপ্স।

https://play.google.com/store/apps/details?id=com.islamboi.rizwan]


Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন