মওলিদুন্নবী (ﷺ) উদযাপনের ব্যাপারে মুহাদ্দেসীন-এ-কেরাম ও ইমামবৃন্দের দৃষ্টিভঙ্গি (২)

 

মওলিদুন্নবী (ﷺ) উদযাপনের ব্যাপারে মুহাদ্দেসীন-এ-কেরাম ও ইমামবৃন্দের দৃষ্টিভঙ্গি (২)


মওলিদুন্নবী (ﷺ) উদযাপনের পক্ষে ক্বুরআন-সুন্নাহভিত্তিক বিস্তারিত প্রামাণ্য দলিলাদি পেশের পর এই অধ্যায়ে আমরা এতদসংক্রান্ত বিষয়ের সমর্থনে মতামত প্রকাশকারী ইমামবৃন্দের দলিলগুলো উপস্থাপন করবো। বিভিন্ন ইসলামী দেশ ও সময়কালের সাথে সম্পৃক্ত তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি এক্ষেত্রে ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বর্ণনা করা হবে।

মীলাদের এই অনুশীলিত প্রথা ইসলাম ধর্মের মধ্যে সাম্প্রতিক সংযোজন (বেদআত) কিংবা এধরনের রীতি ভারত উপমহাদেশীয় মুসলমানদের দ্বারা-ই কেবল প্রবর্তিত বলাটা একেবারেই ভুল এবং তা বাস্তবতারও পরিপন্থী। বাস্তবতা হলো, মওলিদুন্নবী (ﷺ) স্রেফ পাকিস্তান বা ভারতের মুসলমানদের অনুশীলিত রীতি নয়, কিংবা এটা বেদআত-ও নয়। সমসাময়িককালের মুসলমান সমাজ এই প্রথার প্রবর্তক নন। বস্তুতঃ মওলিদুন্নবী (ﷺ) এমন একটি আনন্দঘন ধর্মীয় অনুষ্ঠান যা দুটি পবিত্র স্থান মক্কা মোয়াযযমা ও মদীনা মোনাওয়ারা এবং গোটা আরব জাহান শতাব্দীর পর শতাব্দী যাবত পালন করে আসছে। ইসলামী বিশ্বের অনারব অংশে এই প্রথা পরবর্তীকালে চালু হয়।

মওলিদুন্নবী (ﷺ) উদযাপনের পক্ষে নেতৃস্থানীয় ইমামমণ্ডলী ও হাদীসবেত্তাবৃন্দের অভিমত ও শরঈ সিদ্ধান্ত নিচে দেয়া হলো:



৬.  ইমাম আবূ শা’মা (৫৯৯-৬৬৫ হিজরী)

ইমাম আবূ শা’মা আবদ্ আল-রাহমান বিন ইসমাঈল (১২০২-১২৬৭ খৃষ্টাব্দ) হলেন ‘সহীহ মুসলিম শরীফের’ ব্যাখ্যাকারী ইমাম নববী (৬৩১-৬৭৭ হিজরী/১২৩৩-১২৭৮ খৃষ্টাব্দ)-এর শায়খ। তিনি তাঁর ‘আল-বা’য়েস ’আলা এনকা’র আল-বিদ’আ ওয়াল-হাওয়া’দিস’ পুস্তকে লেখেন: “আমাদের যুগে প্রবর্তিত সেরা বিষয়গুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে মহানবী (ﷺ)-এর বেলাদত বার্ষিকীর দিনটির উদযাপন। ওই দিন দান-সদকাহ করা হয়, নেক আমল পালন করা হয়, আর উত্তম পোশাক পরা এবং খুশি প্রকাশ করা হয়। এধরনের কর্ম, গরিবদের প্রতি দয়াপরবশ হওয়া ছাড়াও, ইঙ্গিত করে যে মহানবী (ﷺ)-এর প্রতি মানুষের অন্তরে এশক্ব-মহব্বত, শ্রদ্ধা ও (তাঁর) মহিমা (উপলব্ধিসূচক) অনুভূতি বিরাজমান; আর পাশাপাশি আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞতা বিদ্যমান এই কারণে যে তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে সৃষ্টি করে জগতসমূহের জন্যে তাঁরই (খাস) রহমত হিসেবে প্রেরণ করে তাদেরকে আশীর্বাদধন্য করেছেন।” [আবূ শা’মা প্রণীত ‘আল-বা’য়েস ‘আলা এনকা’র আল-বিদআ’ ওয়াল-হাওয়া’দিস’, ২৩-২৪ পৃষ্ঠা; আল-সা’লেহী কৃত ‘সুবুল অাল-হুদা’ ওয়াল-রাশা’দ ফী সীরাতে খায়র আল-’এবা’দ’, ১:৩৬৫; আল-হালাবী, ‘ইনসা’ন আল-উয়ূন ফী সীরাতে আল-আমীন আল-মা’মূন’, ১:৮৪; আহমদ ইবনে যাইনী দাহলা’ন মক্কী, ‘আল-সীরাতে নবববীয়্যা’, ১:৫৩; এবং আল-নাবহানী, ‘হুজ্জাত-আল্লাহি ‘আলাল-’আলামীন ফী মু’জিযা’তে সাইয়্যেদিল মুরসালীন’, ২৩৩ পৃষ্ঠা]

ইরবিলের বাদশাহ আবূ সাঈদ আল-মুযাফফর আল-কাওকাবুরী কর্তৃক মীলাদুন্নবী (ﷺ) উদযাপন ও এই উপলক্ষে তাঁর বিপুল ব্যয় সম্পর্কে আবূ শা’মা বলেন: “এই উত্তম কাজ প্রশংসনীয় এবং এর অনুশীলনকারী গৃহীত ও প্রশংসিত জন।” [আল-সালেহী কৃত ‘সুবুল আল-হুদা’ ওয়াল-রাশা’দ ফী সীরাতে খায়র আল-এবা’দ’, ১:৩৬৩]।




৭. ইমাম সদর আল-দীন মাওহূব বিন উমর আল-জাযারী (বেসাল: ৬৬৫ হিজরী)

মিসরের শীর্ষস্থানীয় ফক্বীহ ইমাম সদর আল-দ্বীন মাওহূব বিন উমর আল-জাযারী আল-শাফেঈ লেখেন: “মওলিদের এই উদযাপন নির্দোষ বেদআত তথা প্রবর্তিত প্রথা। সুন্নাহ’র সাথে সাংঘর্ষিক না হওয়া পর্যন্ত বেদআতসমূহকে মন্দ/দূষণীয় বিবেচনা করা হয় না। আর যতোক্ষণ সেগুলো সুন্নাহের খেলাফ না হয়, ততোক্ষণ সেগুলোকে খারাপ বলে বিচার করা হয় না; অধিকন্তু, মহানবী (ﷺ)-এর মীলাদ উদযাপনে খুশি ও সুখ প্রকাশের সময় কারো নিয়্যত বা উদ্দেশ্য অনুসারেই (কেবল) তিনি পুরস্কৃত হয়ে থাকেন।”

অন্যত্র ইমাম সাহেব আরো বলেন: “মওলিদের উদযাপন একটি বেদআত; তবে এটা নির্দোষ বেদআত। এতদসত্ত্বেও মানুষের কাছে (এর ব্যয় নির্বাহের খাতে) টাকা চাওয়ার কোনো অনুমতি নেই – যদি না নিশ্চিতভাবে জানা যায়, যার কাছে অর্থ চাওয়া হয়েছে তিনি খুশি মনে স্বেচ্ছায় তা দান করতে আগ্রহী। এরকম মানুষের কাছে অর্থ চাওয়া জায়েয, আর আমি আশা করবো তা ‘কারা’হা’ তথা মন্দের পর্যায়ে যেনো না পৌঁছে।” [আল-সা’লেহী প্রণীত ‘সুবুল আল-হুদা’ ওয়াল-রাশা’দ ফী সীরাতে খায়র আল-’এবা’দ’, ১:৩৬৫-৩৬৬]।




৮. ইমাম যাহীর আল-দ্বীন জা’ফর আল-তাযনাতী (বেসাল: ৬৮২ হিজরী)

ইমাম যাহীর আল-দ্বীন জা’ফর বিন ইয়াহইয়া বিন জা’ফর আল-তাযনাতী আল-শাফেঈ (বেসাল: ১২৮৩ খৃষ্টাব্দ) বলেন: “মহানবী (ﷺ)-এর প্রতি পরম ভক্তিশ্রদ্ধা ও এশক্ব-মহব্বত থাকা সত্ত্বেও পুণ্যবান সালাফ আস-সালেহীনের প্রাথমিক যুগে এই (মীলাদের) প্রথা বা রীতি চালু ছিলো না। আমাদের কেউই, এমন কি আমরা সবাই একত্রিত হলেও, কখনোই তাঁদের স্রেফ একজনের এশক্ব-মহব্বত ও ভক্তিশ্রদ্ধারও সমকক্ষ হবো না, যা এমন কি (তাঁদের এশক্ব ও ভক্তির) এক অণূকণার সমান ওজন-ও হবে না। এটা উত্তম বেদআত/নতুন প্রবর্তিত প্রথা হবে – যদি উদযাপনকারী ব্যক্তির নিয়্যত হয় ধার্মিক মানুষদেরকে একত্রিত করে মহানবী (ﷺ)-এর প্রতি সালাত-সালাম প্রেরণ ও গরিব-দুঃস্থ (ফকীর/মিসক্বীন)-দের মাঝে খাদ্য বিতরণ। এই বিবরণের সাথে খাপ খেলে এবং এসব শর্ত পূরণ করলেই (কেবল) সকল সময়ের জন্যে এটা পুরস্কার বয়ে আনবে।” [আল-সা’লেহী রচিত প্রাগুক্ত ‘সুবুল আল-হুদা’, ১:৩৬৪]।




৯.ইবনে তাইমিয়্যা (৬৬১-৭২৮ হিজরী)        

তক্বী আল-দ্বীন আহমদ বিন আবদ্ আল-হালীম বিন আবদ্ আল-সালা’ম বিন তাইমিয়্যা (১২৬৩-১৩২৮ খৃষ্টাব্দ) নিজ ‘এক্বতেদা’ অাল-সিরা’ত আল-মুস্তাক্বীম লি-মুখা’লাফাতে আসহা’ব আল-জাহীম’ পুস্তকে লেখে: “অনুরূপভাবে, কিছু মানুষের দ্বারা যা প্রবর্তিত হয়েছে, খৃষ্টানদের যীশু খৃষ্টের জন্মদিন পালনের প্রতিদ্বন্দ্বিতাস্বরূপ হোক কিংবা মহানবী (ﷺ)-এর প্রতি ভক্তিশ্রদ্ধা ও এশক্ব-মহব্বতের নিদর্শনস্বরূপ-ই হোক, আল্লাহতা’লা হয়তো তাদের এই মহব্বত ও উদ্যমের খাতিরে (তাদেরকে) পুরস্কৃত করতে পারেন – (কিন্তু) মওলিদকে আনন্দোৎসব হিসেবে গ্রহণের বেদআতের খাতিরে নয়।” [ইবনে তাইমিয়্যা লিখিত ‘এক্বতেদা’ আল-সিরা’ত আল-মুস্তাক্বীম লি-মুখালা’ফাতে আসহা’ব আল-জাহীম’, ৪০৪ পৃষ্ঠা]

উক্ত পুস্তকের অন্য অংশে লেখক আরো বলে: “অতএব, মওলিদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও একে মওসেম তথা (উদযাপনের) মৌসূম হিসেবে গ্রহণ করা, যেমনটি অনেকে অনুশীলন করে থাকেন, তাতে নি্যেতের বিশুদ্ধতা ও মহানবী (ﷺ)-এর প্রতি ভক্তিশ্রদ্ধার কারণে নিহিত রয়েছে মহা পুরস্কার। ইতিপূর্বে যেমনটি বলা হয়েছে, কিছু লোক হয়তো সেসব বিষয়কে উত্তম বলে বিবেচনা করতে পারেন, যেগুলোকে ঈমানদারবৃন্দ নিন্দনীয়/দূষণীয় হিসেবে দেখেন।” [ইবনে তাইমিয়ার প্রাগুক্ত ‘এক্বতেদা’ আল-সিরা’ত আল-মুস্তাক্বীম’শীর্ষক পুস্তক, ৪০৬ পৃষ্ঠা]।



১০. ইমাম আবূ আবদ-আল্লাহ বিন আল-হাজ্জ আল-মালেকী (বেসাল: ৭৩৭ হিজরী)

মওলিদুন্নবী (ﷺ)-এর ফযীলত সম্পর্কে ইমাম আবূ আবদিল্লাহ বিন আল-হাজ্জ্ব মুহাম্মদ বিন মুহাম্মদ বিন মুহাম্মদ আল-মালেকী (জন্ম: ১৩৩৬ খৃষ্টাব্দ) নিজ ‘আল-মাদখাল ইলা’ তানমিয়া আল-’আমল বি তাহসীন আল-নিই্যয়া’ত ওয়াল-তানবীহ ‘আলা কাসীর মিনাল-বিদ’ আল-মুহদিসা ওয়াল-’আওয়াঈদ আল-মুনতাহালা’ গ্রন্থে লেখেন:

মহানবী (ﷺ)-কে সোমবার দিন রোযা রাখার কারণ জিজ্ঞাসাকারীর প্রতি উত্তর দেয়ার সময় তিনি এই চমৎকার বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত মাসের বাড়তি গুণ সম্পর্কে ইঙ্গিত করেছেন। তিনি বলেন, “এই (সোমবার) দিনে আমার বেলাদত (তথা ধরাধামে শুভাগমন) হয়েছে।” এই দিনটির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত তাঁর বেলাদতের মাসটি-ও। তাই এটাকে সবচেয়ে উচ্চমর্যাদা দেয়া ও এর প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য; আর এর পাশাপাশি আল্লাহতা’লা যেভাবে পবিত্র মাসগুলোকে পছন্দ করেছেন, ঠিক সেভাবে এই মাসকেও আমাদের পছন্দ করা উচিত। কেননা এই মাসটি সেসব মাসেরই একটি, যেমনটি নবী পাক (ﷺ) ফরমান: “আমি বনূ আদম তথা আদম-সন্তান/মনুষ্যজাতির সাইয়্যেদ বা সরদার। আর এটা কোনো ফখর বা অহঙ্কার/দম্ভ নয়। পয়গম্বর আদম (عليه السلام) ও তাঁর পরবর্তীরা (সবাই) আমার পতাকাতলে (অবস্থিত)।”

বিভিন্ন স্থান ও সময়ের সাথে সম্পৃক্ত ফযীলতগুলো আল্লাহতা’লার সুনির্দিষ্টকৃত এবাদত-বন্দেগীর কারণে হয়েছে। এসব স্থান ও সময়ের নিজস্ব সহজাত কোনো মাহাত্ম্য/শ্রেষ্ঠত্ব নেই; বরং এগুলোর মাহাত্ম্য কেবল এগুলোর সাথে সম্পৃক্ত ওই সব বিশেষ পছন্দের সূত্রেই প্রতিষ্ঠিত। এমতাবস্থায় এই (রবিউল আউয়াল) মাস ও সোমবারের জন্যে আল্লাহতা’লার সুনির্দিষ্টকৃত মাহাত্ম্যগুলো বিবেচনা করুন। আপনি কি সোমবারে রোযা রাখার মহা ফযীলতকে দেখতে পান না – যেহেতু (স্রেফ) প্রিয়নবী (ﷺ) এই দিনেই ধরণীতলে শুভাগমন করেছিলেন?

এই মাস এলে ওপরে উল্লেখিত প্রামাণ্য দলিলের ভিত্তিতে একে সম্মান প্রদর্শন, এর মহিমা বর্ধন ও এর প্রাপ্য পরম শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে হবে। এটা করা উচিত রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি আনুগত্যস্বরূপ, ঠিক যেমনটি তিনি সুনির্দিষ্টকৃত ফযীলতসম্পন্ন সময়গুলোতে নেক আমল/পুণ্যদায়ক কর্ম পালন ও প্রচুর দান-সদকাহ করতেন। আপনি কি বিবেচনা করেননি (বুখারী শরীফে উদ্ধৃত) হযরত ইবনে আব্বাস (رضي الله عنه)-এর বাণীকে যিনি বিবৃত করেন, “রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ছিলেন মানুষের মাঝে সবচেয়ে মহানুভব ও উদার, আর তিনি রমযান মাসে সর্বাধিক বদান্যতা প্রদর্শন করতেন?” অতএব, আমাদেরও উচিত হবে আমাদের সাধ্যানুসারে এ মাসের মহিমা বৃদ্ধির চেষ্টা করা, ঠিক যেমনটি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মহিমাপূর্ণ ক্ষণগুলোতে করতেন।

কেউ হয়তো কূটতর্ক করতে পারে এ কথা বলে: “এসব মহিমাপূর্ণ সময়ে পালিত মহানবী (ﷺ)-এর ‍পুণ্যদায়ক আমল/কর্ম সবাই জানেন, কিন্তু তিনি যেভাবে অন্যান্য মাসে খাস/সুনির্দিষ্ট আমল পালন করেছিলেন, সেভাবে এই (রবিউল আউয়াল) মাসে তিনি কোনো সুনির্দিষ্ট আমল পালন করেননি।” এর জবাবে আমরা বলি: এটা মহানবী (ﷺ) হতে জ্ঞাত উম্মতের প্রতি তাঁরই সদাশয় যত্ন ও আরাম/স্বস্তিদানের আকাঙ্ক্ষার কারণে হয়েছে; বিশেষ করে এটা সেসব বিষয়ের ক্ষেত্রেই হয়েছে, যেগুলো তাঁর আপন যাত/সত্তার সাথে সম্পর্কিত। এর উদাহরণ ও বিষয়বস্তু হলো, প্রিয়নবী (ﷺ) যখন মদীনা মোনাওয়ারাকে হারাম তথা অলঙ্ঘনীয় (স্থান) ঘোষণা করেন, যেভাবে পয়গম্বর ইবরাহীম (عليه السلام) মক্কা মোয়াযযমাকে অলঙ্ঘনীয় (স্থান) ঘোষণা করেছিলেন, তখন হুযূর পূর নূর (ﷺ) প্রাণি শিকার অথবা গাছের ডালপালা কাটার দায়ে শাস্তি বিধান করেননি। এটা তাঁর উম্মতের প্রতি করুণাস্বরূপ, আর তাদের ওপর হতে বোঝা হাল্কা করার খাতিরেই করা হয়েছে। উম্মতের ওপর থেকে বোঝা সহজ করার জন্যে মহানবী (ﷺ) নিজের সাথে সম্পর্কিত আদেশগুলো ছেড়ে দিতেন, এমন কি যদি তা পুণ্যদায়ক/ফযীলতপূর্ণ-ও হতো। [ইবনে আল-হাজ্জ্ব কৃত ‘আল-মাদখাল ইলা’ তানমিয়া আল-’আমল বি তাহসীন আল-নিই্যয়া’ত ওয়াল-তানবীহ ‘আলা কাসীর মিনাল-বিদ’ আল-মুহদিসা ওয়াল-’আওয়াঈদ আল-মুনতাহালা’,২:২-৪; আল-সৈয়ূতী প্রণীত ‘হুসন আল-মাক্বসিদ ফী ’আমল আল-মওলিদ’, ৫৭-৫৯ পৃষ্ঠা; আল-সৈয়ূতী রচিত ‘আল-হা’ওয়ী লিল-ফাতা’ওয়া’, ২০৩-২০৪ পৃষ্ঠা; এবং আল-সা’লেহী লিখিত ‘সুবুল আল-হুদা’ ওয়াল-রাশা’দ ফী সীরাতে খায়র আল-’এবা’দ’, ১:৩৭১-৩৭২]

ইবনে আল-হাজ্জ্ব আল-মক্কী আরো লেখেন:

কেউ হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন, রবিউল আউয়াল মাসের সোমবারে মহানবী (ﷺ)-এর মীলাদ শরীফ হওয়ার পেছনে হেকমত তথা (ঐশী) প্রজ্ঞাটা কী? কেন তিনি ক্বুরআন নাযিল হওয়া রমযান মাসে ও তাতে আবির্ভূত ক্বদরের রাতে (লাইলাতুল ক্বদর), কিংবা আল্লাহতা’লার দ্বারা বিধানকৃত অন্যান্য পবিত্র মাসে, অথবা শা’বান মাসের ১৫ তারিখের রাতে বা শুক্রবারে কিংবা ওর রাতে ধরাধামে শুভাগমন করেননি?

এর প্রত্যুত্তর চারটি দৃষ্টিকোণ থেকে দেয়া যায়:

প্রথমতঃ একটি হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে যে মহান স্রষ্টা আল্লাহ পাক সোমবার দিন সমস্ত গাছ-গাছালি সৃষ্টি করেন। এটা এক মহা ইশারা ধারণ করে; কেননা এতে পরিদৃষ্ট হয় যে সোমবারে রিযক্ব, খাদ্য, ফল/ফসল ও (অনুরূপ) অন্যান্য সকল উত্তম বস্তু সৃষ্টি করা হয়। এগুলো দ্বারাই আদম-সন্তান তথা মনুষ্যকুল বেঁচে থাকে এবং (জীবনকে) উপভোগ করে। রবিউল আউয়াল মাসের এই দিনে মহানবী (ﷺ)-এর আশীর্বাদপূর্ণ মীলাদ/বেলাদত হওয়াটা চোখের শীতলতা ও স্বস্তি বটে; আর তাঁর শুভাগমন দ্বারা উম্মতে মুহাম্মদীকে খায়র তথা ভালাই/কল্যাণের প্রাচুর্য ও মহা বরকত/আশীর্বাদ দান করা হয়।

দ্বিতীয়তঃ আমরা যদি শব্দতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ হতে আরবী ‘রবীঈ’ শব্দটি বিবেচনা করি, তাহলে (দেখতে পাবো) এতে নিহিত রয়েছে সূক্ষ্ম ইঙ্গিত ও শুভ লক্ষণ। আবূ আবদির রাহমান আল-সাক্বলী বলেন, ‘প্রত্যেক ব্যক্তি-ই তার নামের কিছু অংশের ভাগিদার হন।’ এই মাসের শুভ লক্ষণ হলো, প্রিয়নবী (ﷺ)-এর উম্মতকে তাঁর মঙ্গলজনক শুভাগমনের সুসংবাদ দেয়া হয়েছিলো।

তৃতীয়তঃ বসন্তকাল (আল-রবীঈ’) হচ্ছে সব মৌসূমের মধ্যে সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ এবং সেরা মওসূম; আর মহানবী (ﷺ)-এর পবিত্র (ঐশী) বিধান হচ্ছে সবচেয়ে ন্যায়পূর্ণ এবং তা ঐশী বিধানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ-ও।

চতুর্থতঃ সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা আপন মহানতম পয়গম্বর সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের ধরণীতলে শুভাগমনের দিন-ক্ষণকে সম্মানিত করতে চেয়েছিলেন; রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উপরোক্ত (অন্য) সময়গুলোতে শুভাগমন করলে কেউ হয়তো এই ভুল ধারণা পোষণ করতে পারতো যে তিনি ওই সময়ে শুভাগমন করায় সম্মানিত হয়েছেন। [ইবনে আল-হজ্জ্ব, ‘আল-মাদখাল ইলা’ তানমিয়া আল-’আমল বি তাহসীন আল-নিই্যয়া’ত ওয়াল-তানবীহ ‘আলা কাসীর মিনাল-বিদ’ আল-মুহদিসা ওয়াল-’আওয়াঈদ আল-মুনতাহালা’, ২:২৬-২৯; আল-সৈয়ূতী, ‘হুসনু আল-মাক্বসিদ ফী আমল আল-মওলিদ’, ৬৭-৬৮ পৃষ্ঠা; আল-সৈয়ূতী, আল-হাওয়ী লিল-ফাতা’ওয়া’, ২০৭ পৃষ্ঠা; এবং আল-নাবহানী, ‘হুজ্জাত-আল্লাহ ‘আলাল-’আলামীন ফী মু’জেযাত-এ-সাইয়্যেদ আল-মুরসালীন’, ২৩৮ পৃষ্ঠা]।

__________________

মওলিদুন্নবী (ﷺ)-এর উদযাপন ও অনুমতি (১ম খণ্ড)

মূল: শায়খুল ইসলাম ড: মুহাম্মদ তাহিরুল কাদেরী

অনুবাদ: কাজী সাইফুদ্দীন হোসেন

 🌍 ইসলামী বিশ্বকোষ এপ্স।

https://play.google.com/store/apps/details?id=com.islamboi.rizwan]


Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন