কৃতজ্ঞতা প্রকাশের বিভিন্ন প্রচলিত পদ্ধতি
এই পরিচ্ছেদ শেষ করার আগে আমরা আল-ক্বুরআনের আলোকে আল্লাহতা’লার নেয়ামত/আশীর্বাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের বিভিন্ন পদ্ধতি বা পন্থা সংক্ষেপে আলোচনা করতে চাই। মহানবী (ﷺ)-এর বেলাদতের এ আশীর্বাদ লাভের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ নিম্নবর্ণিত যে কোনো উপায়ে করা সম্ভব:
৪.৮.১ খোদায়ী নেয়ামতের স্মরণ ও উল্লেখ (যিকর-তাযকেরা)
ক্বুরআন মজীদে বর্ণিত আল্লাহতা’লার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি পদ্ধতি হচ্ছে তাঁরই নেয়ামতের স্মরণ। সূরা বাক্বারায় এরশাদ হয়েছে:
“হে এয়াক্বুবের বংশধরবৃন্দ! স্মরণ করো, আমার ওই অনুগ্রহকে যা আমি তোমাদের প্রতি করেছি। আর এটাও যে, আমি তোমাদেরকে তোমাদের যুগে সমগ্র বিশ্বের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি।” [আল-ক্বুরআন, ২:৪৭]
সূরা আলে এমরা’নে আল্লাহতা’লা মনুষ্যকুলকে সম্বোধন করে বলেন:
“এবং নিজেদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহকে তোমরা স্মরণ করো, যখন তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ছিলো, তিনি তোমাদের অন্তরগুলোতে সম্প্রীতি সৃষ্টি করে দিয়েছেন। সুতরাং তাঁরই অনুগ্রহক্রমে তোমরা পরস্পর ভ্রাতৃত্ব-বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে গিয়েছো।” [আল-ক্বুরআন, ৩:১০৩; মুফতী আহমদ এয়ার খাঁন (رحمة الله) কৃত নূরুল এরফান]
রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পবিত্র বেলাদত/মীলাদ (ধরণীতলে আবির্ভাব), তাঁর সৌন্দর্য ও হায়াতে তাইয়্যেবা, গুণাবলী ও মো’জেযা (অলৌকিকত্ব) এবং তাঁরই অনুপম বৈশিষ্ট্যাবলীকে স্মরণ করা আল্লাহতা’লার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি অন্যতম মাধ্যম। এই মহিমান্বিত আশীর্বাদকে স্মরণ করে আমরা কেবল নিজেদেরকেই লাভবান করছি; কেননা প্রিয়নবী (ﷺ)-এর যিকর-তাযকেরা সর্বদা-ই আল্লাহতা’লা কর্তৃক পালিত হচ্ছে। প্রতিটি মুহূর্তে পালিত মহানবী (ﷺ)-এর যিকর/স্মরণকে অনুরূপ স্মরণে অতিক্রান্ত পূর্ববর্তী মুহূর্তের চেয়ে অধিকতর মর্যাদা দেয়া হচ্ছে। আল্লাহতা’লা এরশাদ ফরমান:
“এবং নিশ্চয় পরবর্তী জীবন আপনার জন্যে পূর্ববর্তী জীবনের চেয়ে (মাহাত্ম্যে ও সম্মানে) উত্তম।” [আল-ক্বুরআন, ৯৩:৪]
“এবং আমি আপনার জন্যে আপনার স্মরণকে (বিশ্বজগতের সর্বত্র ও পরকালে আমারই স্মরণের সাথে যুক্ত করে) সমুন্নত করেছি।” [আল-ক্বুরআন, ৯৪:৪]
এ থেকে আমরা দেখতে পাই যে মহানবী (ﷺ)-এর যিকর-তাযকেরা (স্মরণ) দ্বারা আমরাই লাভবান হচ্ছি, অন্য কারো লাভের জন্যে এটা নয়। তাঁর বেলাদত শরীফ উপলক্ষে আল্লাহতা’লার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা আমাদের পরকালীন জীবনের উন্নতিরই একটি অসীলা বা মাধ্যম। ইমাম আহমদ রেযা খাঁন সাহেব (১২৭২-১৩৪০ হিজরী) কী সুন্দর বলেছেন তাঁর কবিতায়:
‘ওয়া রাফা’না লাকা যিকরাক’-এর ছায়ায় আপনি আচ্ছাদিত,
কেননা, আপনারই (পবিত্র) বাণী ও স্মরণকে করা হয়েছে উন্নীত। [ইমাম আহমদ রেযা খাঁন রচিত ‘হাদা’য়েক্বে বখশিশ’, ১:১৮]
এবাদত ও বন্দেগী
আল্লাহতা’লার এবাদত ও বন্দেগী/গোলামি করাও (তাঁর প্রতি) কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি মাধ্যম। এরকম কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সেরা মাধ্যমগুলোর মধ্যে কয়েকটি হলো, নামায, রোযা, হজ্জ্ব ও (গরিবের) প্রাপ্য যাকাত।
কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পন্থা হিসেবে গরিব-দুঃস্থকে দান-সদকাহ করা এবং এতিম ও অভাবীদের দেখ-ভাল করাও প্রশংসনীয় আমল হিসেবে পরিগণিত।
৪.৮.৩ প্রাপ্ত আশীর্বাদের ঘোষণা প্রদান
কৃতজ্ঞতা প্রকাশের আরেকটি পন্থা হলো আল্লাহতা’লা কর্তৃক আমাদের প্রতি বর্ষিত আশীর্বাদের ব্যাপারে খুশি প্রকাশ করে তার বেশি বেশি উল্লেখ করা এবং অন্যদেরকেও তা জানানো। ক্বুরআন মজীদে এরশাদ হয়েছে:
“এবং আপন রব্বের নেআমতের খুব চর্চা করুন।” [আল-ক্বুরআন, ৯৩:১১]
পূর্ববর্তী পৃষ্ঠায় আল্লাহতা’লার নেয়ামত স্মরণ করার পক্ষে একটি আদেশ জারি করা হয়েছিল; অর্থাৎ, নেয়ামত অন্তরে স্মরণ করতে হবে এবং জিহ্বা দ্বারা ঘোষণা/উল্লেখ করতে হবে। তবে এই স্মরণটি অন্য কারো জন্যে ছিল না, বরং স্রেফ আল্লাহতা’লার জন্যে ছিল। কিন্তু উপরোক্ত আয়াতে করীমায় নেয়ামতটি ঘোষণা করার আদেশ দেয়া হয়েছে, যার মানে তা অন্যদেরও জানানো উচিত। অতএব, এই দুইয়ের (স্মরণ ও আশীর্বাদের ঘোষণার) মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য হলো এই যে, পূর্ববর্তীটি স্রেফ আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত, অপরদিকে পরবর্তীটি সৃষ্টিকুলের সাথে সম্পর্কিত। উদাহরণস্বরূপ, আল্লাহতা’লা এরশাদ ফরমান:
“সুতরাং আমার স্মরণ করো, আমিও তোমাদের চর্চা করবো। আর আমার কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো এবং আমার প্রতি অকৃতজ্ঞ হয়ো না।” [আল-ক্বুরআন, ২:১৫২]
এখানে স্মরণ করার সহজ মানে হচ্ছে আল্লাহতা’লাকে স্মরণ করা উচিত; অপরদিকে স্বীকার/ঘোষণা করার মানে কিন্তু স্রেফ স্মরণ নয়, বরং তা এমনভাবে প্রকাশ করা যা’তে সৃষ্টিকুল-ও এ সম্পর্কে সচেতন হয়; আর এই ঐশী আজ্ঞার আওতায় যাতে যতো বেশি সংখ্যক মানুষকে সম্ভব আনা যায়।
’নেয়ামতের ঘোষণা’ প্রদানের সবচেয়ে বড় হেকমত তথা ঐশী জ্ঞান-প্রজ্ঞা হলো, অন্যরাও এব্যাপারে সচেতন হয়ে ওঠে। ফলে পূর্ববর্তীটির সাথে পরবর্তীটির আরেকটি পার্থক্য এই যে, পূর্ববর্তীটি একাকী পালন করা যায়; পক্ষান্তরে পরবর্তীটির জন্যে ধর্মীয় সভা-সমাবেশের প্রয়োজন হয়। বস্তুতঃ এই প্রকাশ্য নেয়ামতের শোকরগুজারি (তথা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ) করার জন্যে বড় বড় সভা-সমাবেশের আয়োজন করা উচিত, যাতে যতো বেশি সম্ভব মানুষকে এর সাথে সম্পৃক্ত করা যায়।
৪.৮.৩.১ এই আশীর্বাদের ঘোষণা আমরা কীভাবে দেবো?
প্রিয়নবী (ﷺ)-এর বেলাদত তথা ধরাধামে শুভাগমনের মতো এমন মহা আশীর্বাদপ্রাপ্তি উপলক্ষে তাঁর উম্মতের দ্বারা তা ঘোষণা করার দায়িত্ব পালন একটি লক্ষণীয় বিষয়। মহানবী (ﷺ), তাঁর গুণাবলী ও মহৎ চরিত্র, তাঁর শুভাগমন, সৌন্দর্য ও সদাচারের প্রশংসাসূচক কবিতা আবৃত্তি এবং তাঁর প্রতি সালাত-সালাম পাঠের মাধ্যমেই এটা করা হয়ে থাকে। আর এগুলোর সবই “এবং আপন রব্বের নেআমতের খুব চর্চা করুন” (৯৩:১১) – আয়াতটির তাফসীরের আওতায় পড়ে; উপরন্তু, এই নেয়ামত/আশীর্বাদকে স্মরণ করার আরো অনেক পন্থা বিদ্যমান। কেউ যদি একটু চিন্তা করতেন, তাহলে উপলব্ধি করতে পারতেন যে মওলিদুন্নবী (ﷺ)-এর সমস্ত সভা-সমাবেশ/মাহফিল-ই সাধারণভাবে এরকম (যিকর তথা স্মরণের) বিষয়, আর এসব মাহফিলে এগুলো (বিশেষ) তাৎপর্য বহন করে।
মনে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে: রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মওলিদ শরীফ আমরা কীভাবে পালন করবো? তাঁর যিকর-তাযকেরা’র সীমারেখা-ই বা কতোটুকু? তাঁর প্রশংসা ও গুণের বন্দনা আমাদের কীভাবে করা উচিত? এসব প্রশ্নের উত্তর স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে তাঁরই শানে রচিত ইমাম শরফউদ্দীন বুসীরী (৬০৮-৬৯৬ হিজরী)-এর কাব্যে:
“খৃষ্টানবর্গ তাদের পয়গম্বর সম্পর্কে যে (খোদায়ী) দাবি করেছে, তা ছাড়ো,
অতঃপর মহানবী (ﷺ)-এর শানে যেমনে চাও, উত্তম পন্থায় প্রশংসা করো,
তাঁর সত্তা মোবারকের প্রতি যে সম্মান ও মাহাত্ম্য দিতে চাও, করো তেমনে বন্দনা,
কারণ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর শ্রেষ্ঠত্ব সীমাহীন, কারো মুখে করা সম্ভব নয় তা বর্ণনা।”
ওপরের এই কবিতার ভিত্তিতে প্রিয়নবী (ﷺ)-এর শানে যতো কবিতা আবৃত্তি করা হয়, সবগুলোই প্রশংসনীয় বলে সাব্যস্ত হবে – যতোক্ষণ তা সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা ও তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখবে। (অর্থাৎ, আল্লাহতা’লা স্রষ্টা এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হলেন তাঁরই সৃষ্ট বান্দা, এটা ঈমানের একটা শর্ত)।
__________________
মওলিদুন্নবী (ﷺ)-এর উদযাপন ও অনুমতি (১ম খণ্ড)
মূল: শায়খুল ইসলাম ড: মুহাম্মদ তাহিরুল কাদেরী
অনুবাদ: কাজী সাইফুদ্দীন হোসেন
🌍 ইসলামী বিশ্বকোষ এপ্স।
https://play.google.com/store/apps/details?id=com.islamboi.rizwan]
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন