কা’বা শরীফের আচ্ছাদন পরিবর্তন দিবস পালনের প্রামাণ্য দলিল

 

কা’বা শরীফের আচ্ছাদন পরিবর্তন দিবস পালনের প্রামাণ্য দলিল   


জাহেলীয়া তথা অজ্ঞতার যুগে ক্বুরাইশ গোত্র আশূরা দিবসে রোযা পালন করতো, আর তারা দিনটিকে ঈদ হিসেবে উদযাপন করতো। সর্বাধিক করুণার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম-ও মদীনা মোনাওয়ারায় হিজরত করার আগে রোযা রেখে এদিনটি উদযাপন করতেন। তাঁদের এটা পালনের কারণ ছিল এই যে, এদিনেই কা’বা শরীফকে সর্বপ্রথম আচ্ছাদন দেয়া হয়েছিল। এটাই ছিল সুনির্দিষ্ট পটভূমি যার জন্যে মহানবী (ﷺ) মদীনা মোনাওয়ারায় হিজরতের পরে ইহুদীদেরকে তাদের রোযা রাখার কারণ জিজ্ঞেস করেন।

১/ – ইমাম বুখারী (رحمة الله) ঈমানদারদের মা হযরত আয়েশা (رضي الله عنه)-এর কথা বর্ণনা করেন, যিনি বলেন: “ক্বুরাইশ গোত্র অজ্ঞতার যুগে আশূরা’ দিবসের রোযা পালন করতো; অার মহানবী (ﷺ)-ও সেদিন রোযা রাখতেন।” [আল-বুখারী রচিত ‘সহীহ’: ‘কিতাব আল-সওম’ (রোযার পুস্তক), ‘এয়াওমে আশূরা’র রোযা’ অধ্যায়, ২:৭০৪ #১৮৯৮; আল-বুখারী প্রণীত ‘সহীহ’: ‘কিতাব আল-মানাক্বিব’ (সৎ গুণাবলীর বই), ‘অজ্ঞতার যুগ’ অধ্যায়, ৩:১৩৯৩ #৩৬১৯; মুসলিম কৃত ‘আল-সহীহ’: ‘কিতাব আল-সিয়াম’ (রোযার পুস্তক), ‘আশূরা দিবসের রোযা’ অধ্যায়, ২:৭৮২ #১১২৫; আল-তিরমিযী লিখিত ‘আল-জামেউস্ সহীহ’: ‘কিতাব আল-সওম’ (রোযার পুস্তক), ‘আশূরা দিবসের রোযা পালনসম্পর্কিত বর্ণনাসমূহ’ অধ্যায়, ৩:১২৭ #৭৫৩]

অজ্ঞতার যুগে কা’বা শরীফ যখন সর্বপ্রথম আচ্ছাদিত হয়, সেদিনটি ছিল ১০ই মহররম। সে সময় হতে মক্কাবাসী মানুষ প্রতি বছর ওই দিনে রোযা পালন করতেন, আর তারা দিনটিকে ঈদ হিসেবেও উদযাপন করতেন। তাদের এই আচরিত প্রথা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর বেলাদত শরীফের পরেও জারি থাকে, আর প্রিয়নবী (ﷺ) নিজেও কা’বা শরীফের আচ্ছাদনের সে দিনটিতে নিয়মিত রোযা রাখতেন।

২/ – ইমাম বুখারী (رحمة الله) হযরত মা আয়েশা (رضي الله عنه) হতে আরেকটি বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেন, যা’তে তিনি বলেন: “রমযান মাসের রোযা ফরয হবার আগে তারা (আরব জাতি) আশূরা’র রোযা রাখতো। কেননা এই দিনে কা’বা শরীফের ওপর বস্ত্রের আচ্ছাদন দেয়া হতো। রমযান মাসের রোযা ফরয হওয়ার পর মহানবী (ﷺ) এরশাদ ফরমান, ‘কেউ আশূরা’র রোযা রাখতে চাইলে রাখতে পারে, আর কেউ ছেড়ে দিতে চাইলে তাও সে করতে পারে’।” [আল-বুখারী কৃত ‘সহীহ’: কিতাবুল হজ্জ্ব, ‘আল্লাহর কালাম: আল্লাহ কা’বাকে পবিত্র গৃহ বানিয়েছেন’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৫৭৮ #১৫১৫; আল-তাবারানী রচিত ‘আল-মু’জাম আল-আওসাত’, ৭:২৭৮ #৭৪৯৫; আল-বায়হাকী প্রণীত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ৫:১৫৯ #৯৫১৩; এবং ইবনে আবদ আল-বার্র লিখিত ‘আল-তামহীদ লিমা ফী আল-মুওয়াত্তা মিন আল-মা’আনী ওয়া আল-আসানীদ’, ৭:২০৪]  

ইমাম ইবনে হাজের আল-আসক্বালানী (৭৭৩-৮৫২ হিজরী) এই হাদীস সম্পর্কে নিজ ভাষ্যে বলেন:

“এটা বোঝা যায় যে আইয়ামে জাহেলীয়্যা তথা অজ্ঞতার যুগেও তারা স্মরণাতীত কাল হতে কা’বা শরীফকে (বস্ত্র দ্বারা) আচ্ছাদন করে এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতো। এটা তাদের প্রতিষ্ঠিত একটি আচার ছিল। [আল-আসক্বালানী রচিত ‘ফাতহুল বারী’, ৩:৪৫৫]    

ইমাম ইবনে হাজর আসক্বালানী (رحمة الله) তাঁর বইয়ের আরেক জায়গায় অপর একটি কারণ প্রদর্শন করেন:

“ক্বুরাইশ গোত্র কর্তৃক আশূরা’র রোযা রাখার ব্যাপারটি এ-ও হতে পারে যে তারা পূর্ববর্তী শরীয়ত হতে এটা পেয়েছিল, আর এ কারণেই তারা সে দিনটিতে কা’বা শরীফকে আচ্ছাদন করে এর প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতো।” [প্রাগুক্ত ‘ফাতহুল বারী’, ৪:২৪৬]  

ইমাম তাবারানী (২৬০-৩৬০ হিজরী) কা’বা শরীফের ওপর বস্ত্রের আচ্ছাদন দেয়ার ব্যাপারে নিজ ‘আল-মু’জাম আল-কবীর’ (৫:১৩৮ #৪৮৭৬) গ্রন্থে হযরত যায়দ ইবনে সাবেত (رضي الله عنه)-কে উদ্ধৃত করেন, যিনি বলেন:

“এয়াওমে আশূরা এমন দিন নয় যেমনটি মানুষেরা ধারণা করেন। এটা কেবল ওই দিন-ই, যা’তে কা’বা শরীফের আচ্ছাদন দেয়া হয়; আর এ দিনটি সারা বছর ঘুরে ঘুরে আসতো।” [আল-হায়তামী কৃত ‘মজমাউল যওয়াঈদ ওয়া মানবা’আ আল-ফাওয়াঈদ’, ৩:১৮৭; আল-আসক্বালানী প্রণীত ‘ফাতহুল বারী’, ৪:২৪৮; এবং আল-আসক্বালানী রচিত ‘ফাতহুল বারী’, ৭:২৭৬]      

কা’বা শরীফের আ্চ্ছাদনের দিনটিকে সম্মান করা কিছু মানুষের জন্যে বিভ্রান্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা বলেন, কা’বাকে বস্ত্র দ্বারা আচ্ছাদন করা হলে ওর প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের কী দরকার? তাদের এই বক্তব্য সঠিক নয়, কেননা মহাসম্মানিত নবী করীম (ﷺ) খোদ এই দিনটির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছেন। অনুরূপভাবে, আরো কিছু মানুষের সন্দেহ (বাতিক) রয়েছে যে মহানবী (ﷺ)-কে (দুনিয়াতে) প্রেরণের মুল উদ্দেশ্য ছিল আমাদেরকে ক্বুরআন-সুন্নাহ শিক্ষাদান, উপরন্তু তাঁর বেলাদত তথা ধরাধামে শুভাগমন দিবস বহুদিন আগের ঘটনা; প্রিয়নবী (ﷺ) তাঁর দায়িত্ব ও কর্তব্য পূর্ণ করেছেন দেখে তাঁর মীলাদ উদযাপনের প্রয়োজনীয়তা কোথায়? তাঁর সুন্নাহ’কে আঁকড়ে ধরা এবং তাঁর শিক্ষাকে আমাদের জীবনে বাস্তবায়ন করাই কি যথেষ্ট নয়?

এই প্রশ্ন ও এ জাতীয় অন্যান্য প্রশ্নের জবাব দেয়ার আগে সকল ঈমানদারের পক্ষে মহানবী (ﷺ)-এর প্রকৃত মর্যাদা ও গুণগত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সচেতন হওয়া একান্ত জরুরি; মানবজাতির মাঝে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে প্রেরণের উদ্দেশ্য, তাঁর নিখুঁত অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত এবং ক্বুরআন নাযেল ইত্যাদি বিষয়ে আগে উপলব্ধি করা গুরুত্বপূর্ণ; ইসলামী সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে ধাপে ধাপে তার উন্নয়ন সম্পর্কে সমঝদারিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

যেদিনটিতে কা’বাকে আচ্ছাদিত করা হয়, তা বছর ঘুরে আপনাআপনি ফিরে ফিরে আসে। আরব জাতি কা’বা শরীফের খাতিরেই ওই দিনটিকে সম্মান প্রদর্শন করতেন। আর এটা পরবর্তীকালে স্বাধীন একটা উদযাপনেও পরিণত হয়। এ কারণেই মীলাদুন্নবী (ﷺ)-এর দিনটি, যদিও বহু শতাব্দী আগে তা ঘটেছিল, তবূও তা প্রতিবার বছর ঘুরে এলে (আমাদের) শ্রদ্ধা পাওয়ার যোগ্য; এই দিনটিকে শ্রদ্ধা করা এবং এতে খুশি প্রকাশ করা একদম অপরিহার্য। এমন কি আবূ লাহাব-ও মহানবী (ﷺ)-এর বেলাদত-লগ্নে খুশি হয়ে (বার্তা বহনকারিনী) তার দাসী সোয়াইবিয়াকে (আঙ্গুলের ইশারায়) মুক্ত করে দিয়েছিল, যার ফলশ্রুতিতে প্রতি সোমবার তার (পারলৌকিক) শাস্তি লাঘব হয়। প্রিয়নবী (ﷺ) স্বয়ং দুনিয়াবী হায়াতে থাকাকালীন তাঁর মীলাদ দিবসকে উদযাপন করতেন। অতএব, মওলিদুন্নবী (ﷺ)-এর উদযাপন শুধু জায়েয তথা অনুমতিপ্রাপ্ত-ই নয়, বরং তা মনোনীত পয়গম্বর (ﷺ)-এর সুন্নাহ হিসেবেও সুপ্রতিষ্ঠিত।

__________________

মওলিদুন্নবী (ﷺ)-এর উদযাপন ও অনুমতি (১ম খণ্ড)

মূল: শায়খুল ইসলাম ড: মুহাম্মদ তাহিরুল কাদেরী

অনুবাদ: কাজী সাইফুদ্দীন হোসেন

 🌍 ইসলামী বিশ্বকোষ এপ্স।

https://play.google.com/store/apps/details?id=com.islamboi.rizwan]


Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন