কেন এক কাফেরের শাস্তি লাঘব করা হয়েছে?
ওপরে উপস্থাপিত বর্ণনা হতে এ প্রশ্নের উদ্ভব হতে পারে: ক্বুরআন, হাদীস ও উম্মতের এজমা’ তথা ঐকমত্য স্পষ্টভাবে যেখানে ব্যক্ত করেছে যে কোনো অবিশ্বাসীরই (নেক) কর্ম পরলোকে পুরস্কৃত হবার নয়, সেখানে আবূ লাহাবের শাস্তি লাঘব করা হয়েছে কেন? এই প্রশ্নের উত্তর হলো, কর্মটি যেহেতু মহানবী (ﷺ)-এর সাথে সুনির্দিষ্টভাবে জড়িত, সেহেতু এটাকে পুরস্কৃত করা হয়েছে: আবূ লাহাব প্রিয়নবী (ﷺ)-এর বেলাদত (ধরাধামে শুভাগমন) উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করতেই দাসী সুয়াইবিয়াকে মুক্ত করে দিয়েছিলো; এ কারণেই আল্লাহতা’লা পরকালে শাস্তি লাঘব করে তার প্রতি দয়া করেছেন। এটা স্পষ্ট যে মহানবী (ﷺ)-এর সাথে জড়িত কোনো উত্তম কর্ম কোনো অবিশ্বাসী সম্পাদন করলে তা পুরস্কারবিহীন রবে না।
প্রতি সোমবার আবূ লাহাবের শাস্তি লাঘব হওয়াটা তার দ্বারা স্রেফ সুয়াইবিয়াকে মুক্ত করার কারণে হয়নি। বরঞ্চ তা একমাত্র তার দ্বারা হুযূর পাক (ﷺ)-এর বেলাদত উপলক্ষে খুশি প্রকাশের সুবাদেই হয়েছে। সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা এটা দেখেন না কে (নেক) কর্মটি করেছে, বরং দেখেন কার জন্যে করা হয়েছে। ওই কর্মটি আবূ লাহাবের মতো অবিশ্বাসী করেছে, সেটা দেখার বিষয় নয়, বরঞ্চ আল্লাহতা’লার মহব্বত কেবলমাত্র তাঁর রাসূল (ﷺ)-এরই জন্যে (সুনির্দিষ্ট)।
এই বিষয়টিকে আরো প্রতিপাদন করার উদ্দেশ্যে মুহাদ্দীস তথা হাদীসশাস্ত্রের উলামাদের খোলাসা বয়ান নিচে পেশ করা হলো:
১/ – ইমাম আল-বায়হাক্বী (৩৮৪-৪৫৮ হিজরী) নিজ ‘শু’আব আল-ঈমান’ গ্রন্থে মহানবী (ﷺ)-এর জন্যে খাস তথা সুনির্দিষ্ট এই বিষয়টি সম্পর্কে বলতে গিয়ে লেখেন যে এমন কি একজন অবিশ্বাসীও হুযূর পাক (ﷺ)-এর প্রতি আপন খেদমতের মাধ্যমে লাভবান হতে পারেন: “ওয়া হাযা’ আয়দা’ন লিয়ান্নাল্ এহসা’না কা’না মারজা’উহু ইলা সোয়া’হেবেন্নুবূওয়্যাতে ফালাম এয়াদিঈ” – অর্থাৎ, এবং উপরন্তু এই এহসান তথা দয়া/অনুগ্রহ মহানবী (ﷺ)-এর সূত্রে হওয়ার কারণে এটা বিফলে যায়নি। [আল-বায়হাক্বী, ‘শু’আবুল ঈমান’, ১:২৬১ #২৮১]
২/ – ইমাম আল-বাগাভী (৪৩৬-৫১৬ হিজরী) লেখেন: এটা রাসূলাল্লাহ (ﷺ)-এরই জন্যে সুনির্দিষ্ট; তাঁরই মহাসম্মানের খাতিরে কৃত। [আল-বাগাভী, ‘শরহে সুন্নাহ’, ৯:৭৬]
৩/ – ইমাম সুহায়লী (৫০৮-৫৮১ হিজরী) একই মত পোষণ করে বলেন: আবূ লাহাব বিবৃত করেছিলো, ‘তোমাদেরকে ছেড়ে আসার পর আমি কোনো স্বস্তি পাইনি, স্রেফ এথেকে তেষ্টা মেটোনো ব্যতিরেকে’ – সে একথা বলার সময় নিজের তর্জনী ও বুড়ো আঙ্গুলের মাঝখানটা দেখিয়েছিলো; সে আরো বলে, ‘এটা সুয়াইবিয়াকে মুক্ত করার কারণে হয়েছে।’ সহীহ আল-বুখারী ছাড়া অন্যান্য সূত্রে বর্ণিত, তার আত্মীয়স্বজনের মধ্যে যে ব্যক্তি তাকে স্বপ্নে দেখেছিলেন, তিনি তারই ভাই হযরত আব্বাস (رضي الله عنه)। তিনি বর্ণনা করেন, “পুরো একটি বছর অতিক্রান্ত হলেও আমি আবূ লাহাবকে স্বপ্নে দেখিনি। অতঃপর আমি তাকে মসীবতে দেখতে পাই। সে বলে, ‘তোমাদের ছেড়ে আসার পর আমি কোনো স্বস্তি পাইনি, শুধু সোমবার দিনগুলোতেই আমার শাস্তি লাঘব করা হয়।’ এটা এ কারণে যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সোমবারে ধরণীতলে শুভাগমন করেন। সুয়াইবিয়া আবূ লাহাবকে হুযূর (ﷺ)-এর বেলাদতের সুসংবাদ এনে দেন একথা বলে, ‘আপনি কি জানেন আপনার ভ্রাতা আবদুল্লাহ’র ঔরসে এক পুত্র সন্তানের মা হয়েছেন আমিনা (رضي الله عنه)?’ একথা শুনে আবূ লাহাব তাকে বলে, ‘যাও, তুমি মুক্ত!’ এটাই (অর্থাৎ, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সা্লামের বেলাদতে খুশির এই অভিব্যক্তিটি) তার উপকারে আসে। [আল-সুহায়লী, ‘আল-রওদ আল-উনুফ ফী তাফসীর আল-সীরাত আল-নববীয়্যা লি-ইবনে হিশা’ম’, ৩:৯৮-৯৯]
৪/ – শীর্ষস্থানীয় তাফসীরকারক ইমাম আল-ক্বুরতুবী (বেসাল: ৬৭১ হিজরী) লেখেন: এই (শাস্তি) লাঘব এক্ষেত্রেই খাস্ তথা সুনির্দিষ্টকৃত এবং তাদের ক্ষেত্রেও সুনির্দিষ্ট হবে যাদের কথা ধর্মশাস্ত্রলিপিতে উল্লেখিত হয়েছে। [আল-আইনী, ‘উমদাত আল-ক্বারী শরহে সহীহ আল-বুখারী’, ২০:৯৫]
৫/ – সহীহ বুখারীর ব্যাখ্যাকারী ইমাম আল-কিরমানী (৭১৭-৭৮৬ হিজরী) লেখেন: মহানবী (ﷺ)-এর সাথে সংশ্রিষ্ট (কোনো অবিশ্বাসীর কৃত) নেক কর্মের সেই ক্ষেত্রবিশেষে সুনির্দিষ্ট (মানে খাস্) হওয়াটা সম্ভব। [আল-কিরমানী, ‘আল-কাওয়া’কিব আল-দারা’রী ফী শরহে সহীহ আল-বুখারী’, ১৯:৭৯]
৬/ – সহীহ বুখারীর ব্যাখ্যাকারী ইমাম বদর আল-দ্বীন আল-আইনী (৭৬২-৮৫৫ হিজরী) লেখেন:“এয়াহ্‘তামিলু আইঁয়্যাকূনা মা এয়াতা’আল্লাক্বু বিন্নাবিইয়্যা সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামা মাখসূসা’ম্মান যালিকা” – অর্থাৎ, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাথে সম্পৃক্ত যা-ই কিছু করা হোক না কেন, তা ওই ক্ষেত্রে খাস্ বা সুনির্দিষ্ট হওয়াটা সম্ভব। [আল-আইনী, ‘উমদাত আল-ক্বারী শরহে সহীহ আল-বুখারী’, ২০:৯৫]
৭/ – ইমাম জালালউদ্দীন সৈয়ূতী (৮৪৯-৯১১ হিজরী) নিজ ‘হুসন আল-মাক্বসিদ ফী ’আমল আল-মওলিদ’ ও ‘আল-হাউঈ লিল-ফাতা’ওয়া’ গ্রন্থ দুটোতে সুস্পষ্টভাবে এই অবস্থানের পক্ষ সমর্থন করেছেন।
৮/ – ইমাম আবদুর রাহমান বিন দাবী আল-শায়বা’নী (৮৬৬-৯৪৪ হিজরী) লেখেন: আবূ লাহাবের শাস্তি লাঘব স্রেফ মহানবী (ﷺ)-এর শান-মানের ওয়াস্তে করা হয়েছিলো। [আল-শায়বানী, ‘হাদা’য়েক্ব আল-আনওয়া’র’, ১:১৩৪]
এসব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ হতে এটা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে এমন কি আবূ লাহাবের মতো কট্টর অবিশ্বাসী-ও মহানবী (ﷺ)-এর বেলাদত উপলক্ষে প্রকাশিত তার উদ্দেশ্যবিহীন খুশির কারণে পরলোকে শেষ বিচার দিবস অবধি পুরস্কৃত হয়েছে। আর একমাত্র সর্বোচ্চ মর্যাদাবান পয়গম্বর (ﷺ)-এর সাথে সংশ্লিষ্টতার কারণেই কোনো অবিশ্বাসীকে পুরস্কৃত করা হয়ে থাকে।
__________________
মওলিদুন্নবী (ﷺ)-এর উদযাপন ও অনুমতি (১ম খণ্ড)
মূল: শায়খুল ইসলাম ড: মুহাম্মদ তাহিরুল কাদেরী
অনুবাদ: কাজী সাইফুদ্দীন হোসেন
🌍 ইসলামী বিশ্বকোষ এপ্স।
https://play.google.com/store/apps/details?id=com.islamboi.rizwan]
إرسال تعليق