মওলিদুন্নবী (ﷺ)-এর পক্ষে ইমাম আসকালানী (رحمة الله)-এর প্রামাণিক দলিল

 

 মওলিদুন্নবী (ﷺ)-এর পক্ষে ইমাম আসকালানী (رحمة الله)-এর প্রামাণিক দলিল


ইমাম ইবনে হাজর আসক্বালানী (৭৭৩-৮৫২ হিজরী) ওপরে উদ্ধৃত হাদীসগুলোর ভিত্তিতে ‘এয়াওমে আশূরা’র শরঈ বৈধতা সম্পর্কে বেশ গভীর গবেষণা করেছেন এবং তা থেকে মওলিদুন্নবী (ﷺ) উদযাপন জায়েয হওয়ার বিষয়টিকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ইমাম জালালউদ্দীন সৈয়ূতী (৮৪৯-৯১১ হিজরী) ইমাম আসক্বালানী (رحمة الله)-এর ওই সিদ্ধান্ত লিপিবদ্ধ করেন নিচে:

এই যুগের হাফেয, শায়খুল ইসলাম আবূল ফযল ইবনে হাজর আসক্বালানী (رحمة الله)-কে মওলিদের অনুশীলন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়, আর তিনি জবাবে বলেন:

“মওলিদের যে একটি প্রতিষ্ঠিত ভিত্তি আছে, তা আমি জানতে পেরেছি; আর তা সহীহাইন (বুখারী ও মুসলিম) গ্রন্থগুলোতে পাওয়া যায়। (ওগুলোর বর্ণনামতে) মহানবী (ﷺ) মদীনা মোনাওয়ারায় প্রবেশ করেন এবং তিনি ইহুদীদেরকে ‘এয়াওমে আশূরা’য় রোযা রাখতে দেখেন। তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলে তারা উত্তরে বলেন, ‘এই দিনটিতে আল্লাহতা’লা ফেরাউনকে পানিতে ডুবিয়ে মারেন এবং পয়গম্বর মূসা (عليه السلام)-কে রক্ষা করেন। আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতার নিদর্শনস্বরূপ আমরা এই দিনে রোযা পালন করে থাকি।’

“কোনো নির্দিষ্ট দিনে আল্লাহতা’লা কর্তৃক বর্ষিত আশীর্বাদ অথবা দুঃখকষ্ট হতে তাঁর প্রদত্ত সুরক্ষাপ্রাপ্তি উপলক্ষে সর্বশক্তিমান প্রভুর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের রীতি ও প্রতি বছর তা স্মরণার্থে পালন এই দলিলে বৈধ সাব্যস্ত হয়।

”আল্লাহতা’লার প্রতি কৃতজ্ঞতা বিভিন্ন ধরনের এবাদত-বন্দেগী দ্বারা প্রকাশ করা যায়, যার মধ্যে রয়েছে, সেজদা (নামায), রোযা, দান-সদকাহ ও ক্বুরআন তেলাওয়াত। অতঃপর রহমতের নবী (ﷺ)-এর এই ধরণীতলে শুভাগমন দিবসের চেয়ে শ্রেষ্ঠতর খোদায়ী আশীর্বাদের উপলক্ষ আর কী হতে পারে?” [ইমাম সৈয়ূতী (رحمة الله) কৃত ‘হুসন আল-মাক্বসিদ ফী আমল আল-মওলিদ’, ৬৩ পৃষ্ঠা; ইমাম সৈয়ূতী প্রণীত ‘আল-হাওয়ী লিল-ফাতাওয়াঈ’, ২০৫-২০৬ পৃষ্ঠা; আল-সালেহী রচিত ‘সুবুল আল-হুদা’ ওয়াল-রাশা’দ ফী সীরায়ে খায়র আল-এবা’দ’, ১:৩৬৬; আল-যুরক্বানী লিখিত ‘শরহে মাওয়া’হিব আল-লাদুন্নিয়া বিল-মিনাহ আল-মুহাম্মদীয়া’, ১:২৬৩; শায়খ আহমদ যাইনী দাহলান মক্কী কৃত ‘আল-সীরা আল-নববীয়্যা’, ১:৫৪; এবং ইমাম নাবহানী প্রণীত ‘হুজ্জাত আল্লাহ ’আলাল আলামীন ফী মো’জিযাতে সাইয়্যেদ আল-মুরসালীন’, ২৩৭ পৃষ্ঠা]

ইমাম ইবনে হাজর আসক্বালানী (رحمة الله) মওলিদুন্নবী (ﷺ) উদযাপনের ভিত্তিস্বরূপ সহীহ বুখারী ও মুসলিমের হাদীসগুলোকেই তাঁর উত্তরে পেশ করেছেন। এসব হাদীসে প্রিয়নবী (ﷺ) ইহুদীদের আচরিত প্রথাকে সমর্থন করেছেন, যা দ্বারা তাদের প্রতি বর্ষিত আশীর্বাদের উপলক্ষে তারা কৃতজ্ঞতার নিদর্শনস্বরূপ উৎসব পালনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে খুশি প্রকাশ করতেন। মহানবী (ﷺ)-এর অনুমোদনের ফলে এ প্রথাটি সুন্নাহ’র মর্যাদা পেয়েছে।

প্রিয়নবী (ﷺ) যেদিন এই ধরাধামে শুভাগমন করেন, তার চেয়ে শ্রেষ্ঠতর দিবস আর কী-ই বা হতে পারে? এমতাবস্থায় মওলিদুন্নবী (ﷺ)-কে ঈদ হিসেবে উদযাপন করা যাবে না কেন? ইমাম জালালউদ্দীন সৈয়ূতী (رحمة الله) ইমাম ইবনে হাজর আসক্বালানী (رحمة الله)-এর সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন, যা তাঁরই ফতোওয়াসমূহের সংকলন ‘আল-হা’ওয়ী লিল-ফাতা’ওয়া’ঈ’ শীর্ষক গ্রন্থের ২০৫-২০৬ পৃষ্ঠাগুলোতে বিদ্যমান। ইমাম ইবনে হাজর আসক্বালানী (رحمة الله) আশূরা’র রোযাকে দালিলিক প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেছেন; যদিও পয়গম্বর মূসা (عليه السلام)-কে প্রদত্ত বিজয় বহুকাল আগেকার ঘটনা ছিল, তথাপিও আশূরা দিবসকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উপলক্ষ হিসেবে বছরের অন্যান্য দিন হতে আলাদাভাবে বেছে নেয়া হয়েছে। এ থেকে আমরা দেখতে পাই যে, ঘটনাটির পুনরাবৃত্তি না ঘটলেও ওই দিনের মহত্ত্ব বারবার প্রকাশ পায়; ঠিক যেমনটি জানা যায় মহানবী (দ;)-এর বেলাদত দিবস প্রতি সোমবারে আবূ লাহাবের আযাব (শাস্তি) লাঘব হয় [অনুবাদকের জ্ঞাতব্য: কেননা ওই দিন খুশি হয়ে সে আঙ্গুলের ইশারায় হুযূরের বেলাদতের সুসংবাদ বহনকারিনী দাসী সোয়াইবিয়াকে মুক্ত করে দিয়েছিল]।

রমযান মাসের রোযা ফরয হওয়ার আগে ‘এয়াওমে আশূরা’র রোযা মুসলমানদের জন্যে ফরয ছিল [আল-তাহাবী কৃত ‘শরহে মা’আনী আল-আসার: কিতাব আল-সওম (রোযা-বিষয়ক পুস্তক), ‘এয়াওমে আশূরা’র রোযা অধ্যায়’, ২:১২৯-১৩২; এবং আল-আঈনী প্রণীত ‘উমদাত আল-ক্বারী শরহে সহীহ আল-বুখারী’, ১১:১২০]। রমযান মাসের রোযা ফরয হওয়ার পর এই বিধান রহিত করা হয় [ইমাম বুখারী (رحمة الله) হযরত মা আয়েশা (رضي الله عنه) হতে বর্ণনা করেন যে মহানবী (ﷺ) এয়াওমে আশূরা’র রোযা পালনের আদেশ দেন। (কিন্তু) যখন রমযান মাসের রোযা পালন বাধ্যতামূলক করা হয়, তখন এয়াওমে আশূরা’র রোযা পালন করা বা না করা প্রত্যেকের নিজ নিজ পছন্দের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়। (ইমাম বুখারী রচিত ‘সহীহ’: কিতাব আল-সওম, ‘এয়াওমে আশূরা’র রোযা’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৭০৪ #১৮৯৭-১৮৯৮)]। কিছু মানুষের মনে হয়তো এই বিভ্রান্তি দেখা দিতে পারে যে এয়াওমে আশূরা পালনের আদেশ রহিত হয়ে যাওয়ার দরুন বর্তমানে এর ফযীলত/পুণ্য নিঃশেষ হয়ে গিয়েছে। এর জবাব হলো, রমযান মাসের রোযা ফরয হওয়ার পরে অন্য কোনো মাসে রোযা রাখার বাধ্যবাধকতা আর অবশিষ্ট ছিল না। এতদসত্ত্বেও আশূরা’র রোযা পালনের অনুমতি বহাল আছে। এটা এ কারণে যে রাসূলূল্লাহ (ﷺ) আশূরা’র রোযার বাধ্যবাধকতা রহিত করার পর এ কথা বলেননি, “আমাদের আর এরপর থেকে পয়গম্বর মূসা (عليه السلام)-এর ওপর কোনো হক্ব বা অধিকার নেই।” অথচ এর বিপরীতে ওই রোযা বাধ্যতামূলক করার সময় তিনি ঘোষণা করেছিলেন, “তোমাদের (মানে ইহুদীদের) চেয়ে পয়গম্বর মূসা (عليه السلام)-এর ওপর আমাদের আরো বেশি হক্ক (তথা অধিকার) রয়েছে।”

আশূরা’র রোযা রহিতকরণ সত্ত্বেও এর ফযীলত সম্পর্কে বেশ কিছু হাদীস পাওয়া যায়। এই দিনে রোযা পালন এর রহিতকরণের আগে পুণ্যদায়ক ছিল, আর এটার ফযীলত এর রহিতকরণের পরও জারি আছে। অধিকন্তু এটা একটা গৃহীত বিষয় যে ফযীলত কখনো রহিত হয় না। এই কারণেই এয়াওমে আশূরা’র রহিতকরণ ইমাম ইবনে হাজর আসক্বালানী’র (৭৭৩-৮৫২ হিজরী) নেয়া সিদ্ধান্তের ওপর কোনো প্রভাবই ফেলে না।

আমাদের যদি (যুক্তির খাতিরে) গ্রহণ করতেও হয় যে আশূরা’র রোযার ফযীলত রহিত হয়ে গিয়েছে, তবুও সেটা মওলিদুন্নবী (ﷺ)-এর পক্ষে পেশকৃত আমাদের প্রামাণ্য দলিলের ওপর কোনো প্রভাব ফেলে না। কেননা নিশ্চিতভাবে যাঁরা ওই দিন সবচেয়ে বেশি খুশি হবেন, তাঁরাই (প্রকৃতপ্রস্তাবে) পয়গম্বর মূসা (عليه السلام)-এর ওপর সর্বাধিক হক্কের দাবিদার ব্যক্তিবৃন্দ। প্রিয়নবী (ﷺ) কর্তৃক আশূরা’র দিন রোযা রাখার কারণ ছিল তিনি এই বাস্তবতার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছিলেন যে, কোনো পয়গম্বর (عليه السلام)-এর বিজয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার অনুমতি যদি বহাল থাকে, তাহলে রাসূল (ﷺ)-এর বেলাদত দিবসে কেন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার অনুমতি থাকবে না? প্রিয়নবী (ﷺ)-এর মহৎ প্রকৃতির কারণে তিনি তাঁর বেলাদত দিবসে রোযা রেখে তা উদযাপন করতে তাঁর উম্মতকে প্রকাশ্যে নির্দেশ দেননি; এর পরিবর্তে তিনি প্রতি সোমবার (আপন বেলাদত দিবসে) দৃষ্টান্ত স্থাপন করে রোযা রেখেছেন; আর তিনি এমন কি তা প্রকাশও করেননি, যতোক্ষণ না কেউ তাঁকে এব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছিলেন।

__________________

মওলিদুন্নবী (ﷺ)-এর উদযাপন ও অনুমতি (১ম খণ্ড)

মূল: শায়খুল ইসলাম ড: মুহাম্মদ তাহিরুল কাদেরী

অনুবাদ: কাজী সাইফুদ্দীন হোসেন

 🌍 ইসলামী বিশ্বকোষ এপ্স।

https://play.google.com/store/apps/details?id=com.islamboi.rizwan]


Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন