মহানবী (ﷺ) নিজের বেলাদত-দিবস উদযাপন করেন পশু কুরবানীর মাধ্যমে

 

মহানবী (ﷺ) নিজের বেলাদত-দিবস উদযাপন করেন পশু কুরবানীর মাধ্যমে


আল্লাহতা’লার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে প্রিয়নবী (ﷺ) নিজের বেলাদত দিবস নিজেই পালন করেন। তিনি তাঁর মীলাদের উপলক্ষে একটি পশু ক্বুরবানী করেছিলেন এবং মেহমান খাইয়েছিলেন।

১/ – ইমাম বায়হাক্বী (৩৮৪-৪৫৮ হিজরী) হযরত আনাস বিন মালেক (رضي الله عنه) হতে বর্ণনা করেন, যিনি বলেন: “ইন্নান্নাবি-ইয়্যা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা ‘আক্কা ’আন নাফসিহি বা’আদান্নুবূও-ওয়াতি”; অর্থাৎ, ‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নুবূওয়্যত ঘোষণার পর নিজের জন্যে একটি আক্বীক্বাহ পালন করেন।’ [আল-বায়হাক্বী প্রণীত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ৯:৩০০ #৪৩; আল-মাক্বদিসী কৃত ‘আল-আহাদীস আল-মুখতারা’, ৫:২০৫ #১৮৩৩; আল-নববী রচিত ‘তাহযীব আল-আসমা’ ওয়াল-লুগা’ত’, ২:৫৫৭ #৯৬২; আল-আসক্বালানী লিখিত ‘ফাতহুল বারী’, ৯:৫৯৫; আল-আসক্বালানী প্রণীত ‘তাহযীব আত্ তাহযীব’, ৫:৩৪০ #৬৬১; এবং আল-মিযযী কৃত ‘তাহযীব আল-কামা’ল ফী আসমা’ আল-রিজা’ল’, ১৬:৩২ #৩৫২৩]

২/ – জিয়া’ আল-মাক্বদিসী (৫৬৯-৬৪৩ হিজরী) বর্ণনা করেন হযরত আনাস বিন মালেক (رضي الله عنه)-এর কথা, যিনি বলেন: “ইন্নান্নাবি-ইয়্যা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা ‘আক্কা ‘আন্ নাফসিহি বা’আদা মা বু’ঈসা নাবি-ইয়্যান্”; অর্থাৎ, ‘মহানবী (ﷺ) পয়গম্বর হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পর নিজের জন্যে আক্বীক্বা পালন করেন।’ [আল-মাক্বদিসী লিখিত ‘আল-আহাদীস আল-মুখতা’রা’, ৫:২০৫ #১৮৩২; আল-তাবারানী রচিত ‘অাল-মু’জাম আল-আওসাত’, ১:২৯৮ #৯৯৪; এবং আল-রূএয়ানী কৃত ‘মুসনাদ আল-সাহা’বা’, ২:৩৮৬ #১৩৭১]

৩/ – হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (رضي الله عنه) বর্ণনা করেন: “লাম্মা উলিদান্নাবিই-ইউ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা ’আক্কা ‘আনহু ‘আবদুল মুত্তালিবি বি কাবশিন্”; অর্থাৎ, ‘যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর বেলাদত তথা ধরাধামে শুভাগমন হয়, তখন আবদুল মুত্তালিব তাঁর পক্ষ হয়ে একটি মদ্দা ভেড়া ক্বুরবানী করেন।’ [ইবনে আসাকির রচিত ‘তারীখে দিমাশক্ব আল-কবীর’, ৩:৩২; আল-হালাবী লিখিত ‘ইনসান আল-‘উয়ূন ফী সীরা আল-আমীন আল-মা’মূন’, ১:১২৮; এবং আল-সুয়ুতী প্রণীত ‘কিফা’য়াত আল-তা’লিব আল-লাবীব ফী খাসা’ইস আল-হাবীব’, ১:১৩৪]   

৪/ – হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (رضي الله عنه) আরো বর্ণনা করেন: “ইন্না ‘আবদাল মুত্তালিবি জা’আলা লাহু মা’দুবাতা ইয়াওমা সা’বি’আতিন্’; অর্থাৎ, ‘হুযূর (ﷺ)-এর (আক্বীক্বার) খাতিরে আবদুল মুত্তালিব সপ্তম দিবসে এক মেজবান খানার বন্দোবস্ত করেন।’ [ইবনে আবদ আল-বার্র কৃত ‘আল-তামহীদ লিমা ফীল মুওয়াত্তা মিনাল মা’আনী ওয়াল-আসা’নীদ’, ২১:৬১; ইবনে আবদ আল-বার্র রচিত ‘আল-ইস্তি’আব ফী মা’রিফা আল-আসহা’ব’, ১:৫১; ইবনে হিব্বান প্রণীত ‘অাল-সিক্বা’ত’, ১:৪২; আল-ক্বুরতুবী লিখিত ‘আল-জামে’ লি-আহকামিল ক্বুরআন’, ২:১০০; এবং ইবনে আল-ক্বাইয়্যেম কৃত ‘যা’দ আল-মা’আদ ফী হুদা’ খায়র আল-’এবাদ’, ১:৮১]

মহানবী (ﷺ)-এর ধরণীতলে শুভাগমনের সপ্তম দিবসে তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিব কর্তৃক তাঁর পক্ষে আক্বীক্বা পালনের ব্যাপারে উলামাবৃন্দের মাঝে কোনো মতপার্থক্য নেই। হাদীসের আলোকে আক্বীক্বা হলো শিশুর মুক্তির একটি মাধ্যম। তাহলে এটা কীভাবে সম্ভব যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজের আক্বীক্বা-ই চল্লিশ বছর পর্যন্ত পিছিয়ে দিয়েছিলেন? সামরা বিন জুনদুব (رضي الله عنه) বর্ণনা করেন যে মহানবী (ﷺ) এরশাদ ফরমান: “কোনো শিশু তার আক্বীক্বা দ্বারাই মুক্তি লাভ করে। (তাই) তার পক্ষে সপ্তম দিবসে একটি ক্বুরবানী দেয়া উচিত।” [আল-তিরমিযী রচিত ‘আল-জা’মে’ আল-সহীহ’: কিতা’ব আল-আদা’হী’ (পশু ক্বুরবানী পুস্তক), ‘আক্বীক্বা’ অধ্যায়, ৪:১০১ #১৫২২; আবূ দাউদ কৃত ‘আল-সুনান’: কিতা’ব আল-দাহা’ইয়্যা (পশু ক্বুরবানীর বই), ‘আক্বীক্বা’ অধ্যায়, ৩:১০৬ #২৮৩৭; এবং ইবনে মা’জাহ লিখিত ‘আল-সুনান’: ‘কিতা’ব আল-যাবা’ইহ্ (পশু জবাই-সংক্রান্ত পুস্তক), ‘আক্বীক্বা’ অধ্যায়, ২:১০৫৬ #৩১৬৫]      

কেউ হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন, মহানবী (ﷺ) তাঁর নুবূওয়্যত লাভের পর কোন্ আক্বীক্বা পালন করেছিলেন? যেহেতু আক্বীক্বা দু বার পালন করা হয় না, সেহেতু এক্ষেত্রে প্রিয়নবী (ﷺ) নিজ বেলাদত উপলক্ষে খুশি প্রকাশের উদ্দেশ্যে একটি পশু ক্বুরবানী করেন; সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রদর্শনের জন্যে তিনি একটি মেজবান খাওয়ানোর আয়োজন করেন। কিছু লোক হয়তো বলতে পারেন, এটা ছিলো স্রেফ একখানি আক্বীক্বা যা তিনি পালন করেছিলেন। আমাদের যদি এটাকে আক্বীক্বা হিসেবে ধরতেই হয়, তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়: আক্বীক্বা মানে কী? বস্তুতঃ এই আক্বীক্বা আপনাআপনি-ই কোনো শিশুর জন্মোপলক্ষে খুশি প্রকাশ ও (আল্লাহর প্রতি) শোকরিয়া/কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনকে বোঝায়। এটাকে কেউ যে নামে ডাকতে চান ডাকতে পারেন, তবে বিষয়বস্তু একই থাকবে; অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তির জন্মোপলক্ষে খুশি প্রকাশ করা।

ইমাম জালালউদ্দীন সৈয়ূতী (৮৪৯-৯১১ হিজরী) তাঁর লেখা ‘হুসনু আল-মাক্বসিদ ফী ‘আমল আল-মওলিদ’ পুস্তকের ৬৪-৬৫ পৃষ্ঠায় হাফেয ইবনে হাজর আসক্বালানী (৭৭৩-৮৫২ হিজরী) প্রদত্ত প্রামাণ্য দলিলের সমর্থনে মওলিদুন্নবী (ﷺ)-এর বৈধতার পক্ষে নিজস্ব একটি মজবুত দলিল পেশ করেন; তিনি লেখেন: ”(এর উদযাপনের) আরেকটি ভিত্তি আলোতে এসেছে, যা বর্ণনা করেছেন ইমাম বায়হাক্বী (رحمة الله) সাহাবী হযরত আনাস (رضي الله عنه) হতে; তিনি বলেন যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর নুবূওয়্যত ঘোষণা করার পরে নিজের জন্যে একটি আক্বীক্বা করেন, যদিও (বাস্তব) ঘটনা হলো তাঁর দাদা ‘আবদুল মুত্তালিব তাঁরই বেলাদত তথা ধরণীতলে শুভাগমনের সপ্তম দিবসে তাঁর পক্ষে একটি আক্বীক্বা পালন করেছিলেন। আক্বীক্বা দ্বিতীয়বার পালন করা হয় না। এ থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া যায় যে, মহানবী (ﷺ)-কে বিশ্বজগতের জন্যে খোদায়ী রহমত/করুণা ও উম্মতের জন্যে মহাসম্মান হিসেবে প্রেরণের খাতিরে তিনি আল্লাহতা’লার প্রতি কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশস্বরূপ ওই আমলটি পালন করেন। অতএব, আমাদের জন্যে এটা প্রশংসনীয় হবে যে আমরা-ও নিজেদের কৃতজ্ঞতা ও খুশি প্রকাশের উদ্দেশ্যে সমবেত হই, খাদ্য বিতরণ করি এবং অনুরূপ ভক্তিমূলক/পুণ্যদায়ক কাজ করি।” [আল-সৈয়ূতী প্রণীত ‘হুসনু আল-মাক্বসিদ ফী ‘আমল আল-মওলিদ’, ৬৪-৬৫ পৃষ্ঠা; আল-সৈয়ূতী কৃত ‘আল-হাউয়ী লি আল-ফাতাওয়া’, ২০৬ পৃষ্ঠঅ; আল-সালেহী রচিত ‘সুবুল আল-হুদা ওয়া আল-রাশাদ ফী সীরা খায়র আল-’এবাদ’, ১:৩৬৭; আল-যুরক্বানী লিখিত ‘শরহে আল-মাওয়াহিব আল-লাদুনিয়া বি আল-মিনাহ আল-মুহাম্মাদীয়্যা’, ১:২৬৩-২৬৪; এবং আল-নাবাহানী প্রণীত ‘হুজ্জাত আল্লাহ ‘অালাল আলামীন ফী মু’জেযাত সাইয়্যেদ আল-মুরসালীন’, ২৩৭ পৃষ্ঠা]

ইমাম জালালউদ্দীন সৈয়ূতী (رحمة الله) স্বয়ং এই প্রশ্নটি অন্তরে পোষণ করেন এবং এর উত্তরে বলেন যে বাস্তবে এটা কোনো আক্বীক্বা ছিলো না। এমন কি মূল লিপিতেও যদি এ কথা বিবৃত হয় যে আক্বীক্বা পালিত হয়েছিলো, তবুও আমাদের বুঝতে হবে যে শব্দটির পারিভাষিক অর্থ এতে ঊহ্য নেই। এর সহজ মানে হলো প্রিয়নবী (ﷺ)-এর বেলাদত উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করতে একটি পশু ক্বুরবানী করা হয়েছিলো। এটার কারণ ছিলো মহানবী (ﷺ)-এর দাদা আবদুল মুত্তালিব ইতোমধ্যেই তাঁর নাতির বেলাদতের সপ্তম দিবসে আক্বীক্বা করেছিলেন। ইমাম জালালউদ্দীন সৈয়ূতী (رحمة الله) তাঁর কথার সপক্ষে যুক্তিস্বরূপ বিবৃত করেন যে আক্বীক্বা জীবনে স্রেফ একবারই পালন করা হয়, দু বার নয়।

কেউ হয়তো আপত্তি করতে পারেন এ কথা বলে, ’আমরা যদি ধরেও নেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর দাদা তাঁর পক্ষে আক্বীক্বা পালন করেছিলেন, তথাপিও আমরা তা গ্রহণ করতে পারি না; কেননা তা আইয়ামে জাহেলীয়াত তথা অন্ধকার যুগে পালিত হয়েছিলো। এই কারণেই মহানবী (ﷺ) তা দ্বিতীয় দফা পালন করেন।’ বস্তুতঃ এই আপত্তির কোনো বৈধ ভিত্তি নেই। যদি তা বৈধ হতো, তাহলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাথে তাঁর স্ত্রী হযরত খাদিজা (رضي الله عنه)-এর বিয়েও বৈধ নয় বলে আমাদের স্বীকার করতে হতো। এই বিয়ের মহরানা আবূ তালেব পরিশোধ করেন। আক্বীক্বা স্রেফ দান-সদকাহ’রই একটি আমল, অপর দিকে বিয়ে হচ্ছে স্বামী-স্ত্রী দু জনের মাঝে একটি চুক্তিনামা। এই আপত্তি যদি সঠিক হতো, তাহলে মহানবী (ﷺ) ও হযরত খাদিজা (رضي الله عنه)-এর মধ্যকার বৈবাহিক চুক্তিনামাও পুনরায় নবায়ন করতে হতো, আর এর পাশাপাশি মহরানাও পুনর্নির্ধারণ করতে হতো। এই আপত্তি অগ্রাহ্য করার কারণ হলো, অন্ধকার যুগে ঘটে যাওয়া যে কোনো অনুমতিপ্রাপ্ত কাজ শরীয়তে গৃহীত। শরীয়তের বিধি-নিষেধ বলবৎ হয় কেবল তা প্রকাশ হওয়ার পরই।

“(এই আদেশের) আগে যা হয়ে গিয়েছে (তা মাফ)” – সূরা নিসা’র (২২ নং) এই আয়াত অনুযায়ী, ইসলাম ধর্মে অন্ধকার যুগের যে কোনো ভুল কাজকে ক্ষমা করা হয়েছে। এ ধরনের প্রত্যেকটি পাপ/ভুল হতে আলাদাভাবে তওবা (অনুতাপ প্রকাশ) করার কোনো প্রয়োজন নেই। অনুরূপভাবে, ওই সময় সংঘটিত সকল প্রশংসনীয় কাজ, যেমন বিয়ে-শাদী, আক্বীক্বা, শপথ ইত্যাদি বহাল আছে এবং সেগুলো বাতিল হয়নি। এ কারণেই ইমাম সৈয়ূতী (رحمة الله) বিবৃত করেন যে শরীয়তে কোনো বৈধ প্রয়োজনীয়তা না থাকার দরুন আক্বীক্বা দু বার করার দরকার নেই। অতএব, এই গোটা আলোচনা থেকে এব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায় যে মহানবী (ﷺ) তাঁর নুবূওয়্যত ঘোষণার পর নিজের বেলাদত উপলক্ষে খুশি ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উদ্দেশ্যে একটি পশু ক্বুরবানী করেছিলেন।

ওপরে পেশকৃত প্রামাণিক দলিল হতে এটা স্পষ্ট যে মওলিদুন্নবী (ﷺ) উদযাপন করা আল্লাহতা’লা, মহানবী (ﷺ) ও তাঁর মহৎ সাহাবাবৃন্দ (رضي الله عنه)-এর সুন্নাত। এই কারণে মুহাদ্দেসীনে কেরাম (رحمة الله) ও আউলিয়া-দরবেশবৃন্দ (رحمة الله) এটার গুণাবলী ও ফায়দাগুলোর ওপর আলোকপাত করেছেন, যেমনটি সীরাহ ও ইতিহাসের বিভিন্ন বইপত্রে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে ইমাম বুখারী (১৯৪-২৫৬ হিজরী) তাঁর ‘সহীহ’ গ্রন্থের ‘কিতা’ব আল-নিকা’হ’ অধ্যায়ে একটি বিখ্যাত ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তবে এ ঘটনা সম্পর্কে আলোচনার আগে কোনো অবিশ্বাসী পরকালে তার কর্মফলের দ্বারা উপকার পায় না মর্মে ক্বুরআন, সুন্নাহ ও উম্মতের (উলামাদের) এজমা’ তথা ঐকমত্য হতে গৃহীত একটি মূলনীতিকে প্রতিষ্ঠা করা জরুরি হবে: অর্থাৎ, তার সৎকর্মের কোনো প্রতিদান নেই, আর তার শাস্তিও লাঘব করা হবে না। তার সৎকর্মের প্রতিদান এ জগতেই সে পাবে [ইমাম আসক্বালানী প্রণীত ‘ফাতহুল বারী’, ৯:১৪৫; এবং আল-আইনী কৃত ‘উমদাত আল-ক্বারী শরহে সহীহ আল-বুখারী’, ২০:৯৫; এ সম্পর্কে আল-ক্বুরআনে এরশাদ হয়েছে: ‘যে ব্যক্তি পার্থিব জীবন ও সেটার সাজ-সজ্জা কামনা করে, আমি তাতে তাদের (কৃতকর্মের) পূর্ণ ফল দিয়ে দেবো এবং এর মধ্যে কম দেবো না। এরা হচ্ছে ওইসব লোক, যাদের জন্যে পরলোকে কিছু নেই, কিন্তু আগুনই; এবং নিষ্ফল হয়েছে যা কিছু ওখানে করতো এবং বিলীন হয়েছে যা তাদের কৃতকর্ম ছিলো’ (১১:১৫-১৬)। অন্যত্র এরশাদ হয়েছে: ’এবং যারা কাফির হয়েছে তাদের কর্ম এমনই, যেমন কোনো মরুভূমিতে রোদে চমকিত বালু; পিপাসার্ত সেটাকে পানি মনে  করে। (একইভাবে পরলোকে) শেষ পর্যন্ত যখন সেটার কাছে আসলো তখন দেখতে পেলো সেটা কিছুই নয় এবং আল্লাহকে নিজের কাছে পেলো। অতঃপর তিনি তার হিসেব পূর্ণমাত্রায় দিলেন; এবং আল্লাহ দ্রুত হিসেব গ্রহণ করেন‘ (২৪:৩৯)। আরো এরশাদ হয়েছে: ‘এবং যা কিছু তারা কাজ করেছিলো, আমি ইচ্ছা করে সেগুলোকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ধূলিকণার বিক্ষিপ্ত অণু-পরমাণু করে দিয়েছি, যা ভেন্টিলেটরের মধ্য দিয়ে পতিত আলোকরশ্মিতে দৃষ্টিগোচর হয়’ (২৫:২৩)]। পরকালে প্রতিদানের সুবিধা স্রেফ মুসলমানদেরই প্রাপ্য হবে, কেননা তাঁরাই আল্লাহতা’লার প্রতি প্রকৃত বিশ্বাস স্থাপন করেছেন (মানে ঈমান এনেছেন) [এ সম্পর্কে ক্বুরআন মজীদে ঘোষিত হয়েছে: ‘তারা আনন্দ উদযাপন করে আল্লাহর নি’মাত ও অনুগ্রহের প্রতি এবং এ জন্যে যে, আল্লাহ মুসলমানদের প্রতিদান বিনষ্ট করেন না। ওই সব লোক, যারা আল্লাহ ও রসূলের আহ্বানে সাড়া দিয়ে হাজির হয়েছে এরপর যে, তারা জখমপ্রাপ্ত হয়েছিলো; তাদের মধ্যকার নেককার (তথা পুণ্যবান) ও পরহেযগারদের জন্যে মহা সওয়াব রয়েছে’ (৩:১৭১-২)। অন্যত্র এরশাদ হয়েছে: ‘এবং আমি সৎকর্মপরায়ণদের শ্রমফল বিনষ্ট করি না। এবং নিশ্চয় পরকালের পুরস্কার তাদের জন্যে উত্তম, যারা ঈমান এনেছে এবং পরহেযগার রয়েছে’ (১২:৫৬-৭)। আরো এরশাদ হয়েছে: ‘নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে, আমি তাদের শ্রমফল বিনষ্ট করি না’ (১৮:৩০)। আরো এরশাদ হয়েছে: ‘এবং শেষ ময়দান পরগেযগারদের হাতে’ (৭:১২৮) এবং ’পরকালের শুভ-পরিণাম খোদাভীরুদেরই’ (২৮:৮৩)]।

চলুন, এবার আমরা ইমাম বুখারী (رحمة الله)-এর সেই রওয়ায়াত বা বর্ণনার দিকে দৃষ্টিপাত করি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর চাচাদের মধ্যে একজন, আবূ লাহাব, যে অবিশ্বাসী হিসেবে মারা গিয়েছিলো, তার কথা এতে উল্লেখিত আছে। আবূ লাহাব প্রিয়নবী (ﷺ)-এর বেলাদত তথা ধরাধামে শুভাগমন উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করেছিলো; আর এরই ফলশ্রুতিতে আল্লাহতা’লা তাকে পরলোকে ফায়দা দান করেন, যদিও সে দ্বীন-ইসলামের সবচেয়ে বড় একজন শত্রু ছিলো। এই ব্যক্তি এমন-ই চরমভাবে লা’নত/অভিসম্পাতপ্রাপ্ত যে ক্বুরআন মজীদের একটি (গোটা) সূরা তারই সম্পর্কে নাযেল হয়েছে: “ধ্বংস হোক আবূ লাহাবের দু হাত এবং সে ধ্বংস হয়েই দিয়েছে। তার কোনো কাজে আসেনি তার সম্পদ এবং না কাজে এসেছে যা সে উপার্জন করেছিলো। এখন ধ্বসে যাচ্ছে লেলিহান আগুনে।” [আল্-ক্বুরআন, ১১১:১-৩]  

এই বিখ্যাত ঘটনাটি ঘটেছিলো হুযূর পাক (ﷺ)-এর বেলাদত শরীফের আগে এবং এটা হাদীস শরীফের বইপত্রে লিপিবদ্ধ আছে। সুওয়াইবিয়া নামে আবূ লাহাবের এক দাসী মা আমিনা’র ডেলিভারীর সময় তাঁর খেদমতে ছিলেন। মহানবী (ﷺ)-এর বেলাদত শরীফ হলে পরে সুওয়াইবিয়া দৌড়ে আবূ লাহাবের কাছে তার ভাতিজার বেলাদতের সুখবরটি পৌঁছে দিতে যান। এই খোশ-খবরী শুনে অাবূ লাহাব আনন্দে আপ্লুত হয় এবং তার দুই আঙ্গুলের ইশারায় সুওয়াইবিয়াকে (দাসত্ব থেকে) মুক্ত করে দেয়।

দ্বীন-ইসলাম (ইসলাম ধর্ম) গ্রহণ না করে আবূ লাহাব মারা যওযার পরে প্রিয়নবী (ﷺ)-এর চাচা হযরত আব্বাস (رضي الله عنه) তাকে স্বপ্নে দেখেন এবং তার অবস্থা সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞেস করেন। সে উত্তর দেয় যে রাত-দিন তাকে শাস্তি পেতে হয়, তবে সোমবার দিনগুলোতে তার শাস্তি লাঘব হয় এবং তার আঙ্গুলগুলো হতে তার জন্যে স্বস্তিদায়ক পানি নির্গত হয়। সোমবার দিনগুলোতে শাস্তি লাঘবের কারণ হলো, ওই দিন তার ভাতিজা হযরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের বেলাদত তথা ধরণীতলে শুভাগমনের সুসংবাদ শুনে সে আনন্দিত হয়ে ওই সুখবর বয়ে আনা দাসী সুয়াইবিয়াকে দুই আঙ্গুলের ইশারায় মুক্ত করে দিয়েছিলো।

এই ঘটনা বর্ণনা করেন হযরত যাইনাব বিনতে আবী সালামা (رضي الله عنه), আর অনেক মুহাদ্দেসীন উলামা এটা রওয়ায়াত করেন। ইমাম বুখারী (رضي الله عنه) তাঁর ‘আল-সহীহ’ পুস্তকে বর্ণনা করেন: “আবূ লাহাব যখন মারা যায়, তখন তার পরিবারসদস্যদের কেউ কেউ তাকে (স্বপ্নে) কঠিন মসীবতে দেখতে পান। তারা তাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমার কী পরিণতি হয়েছে?’ আবূ লাহাব উত্তর দেয়, ‘তোমাদের ছেড়ে আসার পর আমার কোনো ভালাই হয়নি, স্রেফ (মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের বেলাদত উপলক্ষে আনন্দিত হওয়ার সূত্রে আঙ্গুলের ইশারায়) সুয়াইবিয়াকে মুক্ত করে দেয়ার কর্মের দরুন আমার তেষ্টা (পানি দ্বারা) মেটানো হয়’।” [আল-বুখারী প্রণীত ‘সহীহ বুখারী’: ‘কিতাব আল-নিকাহ’ (বিয়ে-শাদীর পুস্তক), ‘এবং আপনার লালন-পালনকারিনী মায়েরা’ শীর্ষক অধ্যায়, ৫:১৯৬১ #৪৮১৩; আবদুর রাযযাক্ব কৃত ‘আল-মুসান্নাফ’, ৭:৪৭৮ #১৩,৯৫৫; আবদুর রাযযাক্ব লিখিত ‘আল-মুসান্নাফ’, ৯:২৬ #১৬,৩৫০; আল-মারূযী রচিত ‘আল-সুন্নাহ’, ৮২ পৃষ্ঠা #২৯০; আল-বায়হাক্বী প্রণীত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ৭:১৬২ #১৩,৭০১; আল-বায়হাক্বী রচিত ‘শু’আব আল-ঈমান’, ১:২৬১ #২৮১; আল-বায়হাক্বী লিখিত ‘দালায়েল আল-নবুওয়্যা ওয়া মা’রেফা আহওয়াল সাহেব আল-শরীয়া’(ﷺ), ১:১৪৯; ইবনে সাআদ কৃত ‘আল-তাবাক্বাত আল-কুবরা’, ১:১০৮; ইবনে আবী দুনইয়া নিজ প্রণীত ‘কিতাব আল-মানা’মাত’, ১৫৪ পৃষ্ঠা, #২৬৩ পুস্তকে ‘হাসান’ এসনাদে এটা বর্ণনা করেন; আল-বাগাবী রচিত ‘শরহে সুন্নাহ’ ৯:৭৬ #২২৮২; ইবনে জাওযী লিখিত ‘সাফওয়া আল-সাফওয়া’, ১:৬২; আল-সুহায়লী কৃত ‘আল-রওদ আল-উনুফ ফী তাফসীর আল সীরা’ আল-নববীয়া লি ইবনে হিশাম’, ৩:৯৮-৯৯; আল-যায়লাঈ প্রণীত ‘নসব আল-রা’য়া লি-আহাদীস আল-হিদায়া’, ৩:১৬৮; ইবনে আসা’কির রচিত ‘তারীখে দিমাশক্ব আল-কবীর’ ৬৭:১৭১-৭২; ইবনে কাসীর লিখিত ‘আল-বেদায়া ওয়াল-নেহায়া’, ২:২২৯-২৩০; আল-আসক্বালানী কৃত ‘ফাতহুল বারী’, ৯:১৪৫; আল-আইনী প্রণীত ‘উমদাত আল-ক্বারী শরহে সহীহ আল-বুখারী’, ২০:৯৫; আল-শায়বানী রচিত ‘হাদায়েক্ব আল-আনওয়ার’, ১:১৩৪; আল-আমিরী লিখিত ‘শরহে বাহজাত আল-মাহা’ফিল’, ১:৪১; এবং আনওয়ার শাহ কাশমিরী কৃত ‘ফায়দ আল-বারী ’আলা সহীহ আল-বুখারী’, ৪:২৭৮]  

ওপরের রওয়ায়াত/বর্ণনাটি যদিও ‘মুরসাল’ (নিচে ‘নোট’ দেখুন), তবুও এটা গৃহীত; কেননা এর বর্ণনাকারী ইমাম বুখারী (১৯৪-২৫৬ হিজরী) নিজ ’সহীহ’ গ্রন্থে এটা লিপিবদ্ধ করেছেন। আর অনেক মুহাদ্দেসীন উলামা এর ওপর নির্ভর করেছেন, যা এর নির্ভরযোগ্যতার সাক্ষ্য বহন করছে। উপরন্তু, এই বর্ণনাটি হালাল (বৈধ) বা হারাম (অবৈধ)-সম্পর্কিত নয়; বরঞ্চ এর বিষয়বস্তু ধর্মীয় পুণ্য-সংক্রান্ত। পুণ্য-সংক্রান্ত বিষয়গুলো নির্ধারণের মানদণ্ড হতে হালাল-হারাম বিষয়গুলো প্রমাণের জন্যে প্রয়োজনীয় মানদণ্ডের পার্থক্য সম্পর্কে উলামাবৃন্দ সম্যক অবগত। [নোট: উসূলে হাদীস তথা হাদীস-মৌলনীতিবিষয়ক শাস্ত্রে ’মুরসাল’ হচ্ছে এমন হাদীস যার সনদ (পরম্পরা) তাবেঈ তথা সাহাবাবৃন্দের পরবর্তী প্রজন্ম পর্যন্ত ফেরত পৌঁছেছে; কিন্তু এই সনদে সাহাবাবৃন্দের নামের উল্লেখ নেই (আল-যাহাবী রচিত ‘আল-মূ’ক্বিযা, ৩৮ পৃষ্ঠা; ইবনে কাসীর প্রণীত ‘অাল-বায়েস্ অাল-হাসীস’, ৪৮ পৃষ্ঠা; ইবনে হাজর আসক্বালানী কৃত ‘শরহে নুখবা আল-ফিকর’, ৩৬-৩৭ পৃষ্ঠা; এবং আল-সাখাভী লিখিত ‘আল-গায়্যা ফী শরহে আল-হেদায়া’, ১:২৭২)। এব্যাপারে সিদ্ধান্ত হলো, কোনো কর্তৃত্বশীল তাবেঈর কাছে ফেরত গিয়ে যদি বর্ণনার সনদ শেষ হয়, তাহলে তা দলিল হিসেবে গৃহীত হবে (আল-যাহাবী, ‘আল-মু’ক্বিযা’, ৩৯ পৃষ্ঠা)। মযহাবের তিন ইমাম, যথা সর্ব-ইমাম আবূ হানীফা (رحمة الله), মালেক (رحمة الله) ও আহমদ (رحمة الله) এবং মুহাদ্দেসীন উলামাবৃন্দের সংখ্যাগরিষ্ঠের মতানুযায়ী মুরসাল হাদীস গৃহীত হওয়ার শর্ত এই যে, যিনি এটা সাহাবী (رضي الله عنه)-এর নাম বাদ দিয়ে বর্ণনা করেন, তাঁকে নির্ভরযোগ্য হতে হবে এবং যাঁর (অর্থাৎ, যে সাহাবীর) কাছ থেকে তিনি এটা গ্রহণ করেছেন, তাঁকেও নির্ভরযোগ্য হতে হবে (আল-সাখাভী, ‘আল-গায়্যা ফী শরহে আল-হেদায়া’, ১:২৭৩; ইবনে কাসীর, ‘আল-বায়েস্ আল-হাসীস’, ৪৮ পৃষ্ঠা; এবং আবদুল হক্ক মুহা্দ্দিসে দেহেলভী, ‘মুক্বাদ্দেমা ফী উসূলিল হাদীস’, ৪২-৪৩ পৃষ্ঠা)। তাঁদের (মুহাদ্দেসীনের) প্রমাণ হচ্ছে কোনো তাবেঈর সম্পৃক্ততা এখানে নিশ্চিত হওয়াটা, আর তাবেঈ একথা বলবেন না, ‘রাসূল (ﷺ) বলেছেন’, কিংবা ‘মহানবী (ﷺ) করেছেন’, অথবা ‘হুযূরের (ﷺ) উপস্থিতিতে এই ঘটনা ঘটেছিলো’, যতোক্ষণ না তাঁরা (মুহাদ্দেসীন) এটা কোনো নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীর কাছ থেকে প্রাপ্ত হন। ইবনে হাজর আসক্বালানী (رحمة الله) তাঁর ‘নুযহা আল-নযর বি-শরহে নুখবা আল-ফিকর’ (৩৭ পৃষ্ঠা) গ্রন্থে লেখেন: “ইমাম আহমদ (رحمة الله)-এর একটি বক্তব্য এবং মালেকী ও হানাফী মযহাবের (অন্তর্ভুক্ত) ইমামমণ্ডলীর সিদ্ধান্ত মোতাবেক এটা নিঃশর্তভাবে গৃহীত। ইমাম শাফেঈ (رحمة الله)-এর দৃষ্টিতে তা যদি অন্য আরেকটি সনদে সমর্থিত হয় – সেটা সংযুক্ত হোক বা মুরসালই হোক – তাহলে তা গৃহীত হবে।” মোল্লা আলী ক্বারী (ইন্তেক্বাল: ১০১৪ হিজরী) নিজ ‘শরহে শরহে নুখবা আল-ফিকর’ পুস্তকে বলেন: “ইবনে জরীর তাবারী বর্ণনা করেন যে তাবেঈনদের মাঝে এটা গ্রহণযোগ্য হওয়ার ব্যাপারে এজমা’ তথা ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাঁদের কাছ থেকে বা ২০০ হিজরী পর্যন্ত তাঁদের পরবর্তী সময়ে আগত ইমামবৃন্দের কাছ থেকেও এর অগ্রহণযোগ্যতার পক্ষে কোনো বর্ণনা নেই। আর তাঁরা হলেন সেরা প্রজন্মসমূহ, যাঁদের ধার্মিকতা সম্পর্কে (স্বয়ং) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-ই সাক্ষ্য দিয়েছেন।”]     

এই রওয়ায়াত (মানে আবূ লাহাবের ঘটনার বর্ণনা)-কে মওলিদুন্নবী (ﷺ) উদযাপনের পক্ষে দলিল হিসেবে যে সকল উলামা-এ-কেরাম গ্রহণ করেছেন, নিম্নে তাঁদের ফতোয়াসমূহের একটি সংকলন পেশ করা হলো:

১/ – হাফেয শামস আল-দ্বীন মুহাম্মদ বিন আব্দিল্লাহ আল-জাযারী (জন্ম: ৬৬০ হিজরী) যিনি ‘উরফ আল-তা’রীফ বিল-মওলিদ আল-শরীফ’ গ্রন্থের প্রণেতা, তিনি লেখেন: “অবিশ্বাসী আবূ লাহাব যার শাস্তির বর্ণনায় ক্বুরঅান মজীদে (সূরা) নাযেল/অবতীর্ণ হয়েছে, সে যদি মহানবী (ﷺ)-এর বেলাদত শরীফের রাতে খুশি প্রকাশের কারণে স্বস্তি পেতে পারে, তাহলে ওই মুসলিমের কী অবস্থা হবে যিনি আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস স্থাপনকারী ও উম্মতে মুহাম্মদী (ﷺ)-এর সদস্য হিসেবে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর বেলাদত শরীফে খুশি প্রকাশ করেন এবং তাঁরই মহব্বতে আপন সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করেন? আমার জীবনের শপথ, তাঁর পুরস্কার রয়েছে পরম করুণাময় আল্লাহরই তরফ থেকে, আর তিনি আল্লাহরই অনুগ্রহে বেহেশতের বাগানে প্রবেশ করবেন।” [আল-সৈয়ূতী, ‘আল-হাওয়ী লিল-ফাতাওয়া,’ ২০৬ পৃষ্ঠা; আল-সৈয়ূতী, ‘হুসনু আল-মাক্বসিদ ফী আমল আল-মওলিদ’, ৬৫-৬৬ পৃষ্ঠা; আল-কসতলানী, ‘আল-মাওয়াহিব আল-লাদুনিয়া বিল-মিনাহ আল-মুহাম্মদিয়া’, ১:১৪৭; আল-যুক্বানী, ‘শরহ আল-মাওয়াহিব আল-লাদুন্নিয়া বিল-মিনাহ আল-মুহাম্মদিয়া, ১:২৬০-২৬১; আল-সালেহী, ‘সুবুল আল-হুদা ওয়াল-রাশাদ ফী সীরাত খায়র আল-েএবাদ, ১:৩৬৬-৩৬৭; এবং আল-নাবহানী, ‘হুজ্জাত আল্লাহ আলাল-আলামীন ফী মু’জাযাত সাঈয়েদ আল-মুরসালীন’, ২৩৭-২৩৮ পৃষ্ঠা]

২/ –  হাফেয শামস আল-দ্বীন মুহাম্মদ বিন নাসির আল-দ্বীন আল-দিমাশক্বী (৭৭৭-৮৪২ হিজরী) নিজ ‘মওরিদ আল-সাদী ফী মওলিদ আল-হাদী’ গ্রন্থে লেখেন: “এটা সঠিক যে আবূ লাহাবের জন্যে দোযখের শাস্তি সোমবার দিনগুলোতে লাঘব করা হয় এ কারণে যে, মহানবী (দ;)-এর বেলাদত শরীফ উপলক্ষে খুশি হয়ে (ওই দিন) সে সুওয়াইবিয়াকে মুক্ত করে দিয়েছিলো।” এরপর লেখক এব্যাপারে কিছু দ্বিচরণ (কবিতা) বর্ণনা করেন:

“এই অবিশ্বাসী, যার উদ্দেশ্যে অবতীর্ণ ভর্ৎসনাপূর্ণ ঐশীবাণী,

জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত যার দুই পাণি,

খুশি প্রকাশের ফলে নিরন্তর সোমবারে যার লাঘব হয় শাস্তি,

তাহলে মহানবী (ﷺ)-এর ওই গোলামের ভাগ্যে মঞ্জুর কতোই না স্বস্তি,

মাহবূব (ﷺ)-এর প্রতি সন্তুষ্টিসহ হয়েছে যাঁর বিশ্বাসীর বেসালপ্রাপ্তি।” [ভাবানুবাদ]

৩/ –  শায়খ আবদুল হক্ব মুহাদ্দীসে দেহেলভী (৯৫৮-১০৫২ হিজরী) এই রওয়ায়াতের ব্যাপারে সুচিন্তিত মতামত ব্যক্ত করতে লেখেন: “এই বর্ণনা মওলিদুন্নবী (ﷺ) উদযাপনের বৈধতার ও তাতে সর্বাত্মক প্রয়াসের পক্ষে একটি (উৎকৃষ্ট) দলিল। আবূ লাহাব, যার উদ্দেশ্যে নিন্দাসূচক ক্বুরআনের একখানি সূরা নাযেল হয়েছে, তার যদি (হুযূরের বেলাদত উপলক্ষে খশি প্রকাশার্থে) দাসীকে মুক্ত করে দেয়ার কারণে শাস্তি লাঘব হতে পারে, তবে ওই মুসলমান যিনি মহানবী (ﷺ)-এর মীলাদ উপলক্ষে খুশি হন এবং অাপন সম্পদ ব্যয় করেন, তাঁর কী (শানদার) অবস্থা হবে? আর হ্যাঁ, অবৈধ নাচ-গানের (বা বর্তমানের ব্যান্ড সঙ্গীতের) মতো বেদআত (নতুন উদ্ভাবিত প্রথা) ও অন্যান্য হারাম কর্মকাণ্ড বর্জন করতে হবে; নতুবা এর আশীর্বাদ থেকে বঞ্চিত হতে হবে।” [আবদুল হক্ব দেহেলভী, ‘মাদারিজ আল-নবুওয়া’, ২:১৯]

৪/- আবদুল হাই ফারাঙ্গী মহল্লী লাখনৌভী (১২৬৪-১৩০৪ হিজরী) লেখেন: “অতএব, আবূ লাহাবের মতো অবিশ্বাসী রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর বেলাদত উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করে যদি কম শাস্তি পেতে পারে, তাহলে যে মুসলমান হুযূর (ﷺ)-এর মীলাদে খুশি প্রকাশ করেন এবং তাঁরই মহব্বতে নিজের সম্পদ ব্যয় করেন – তিনি কি কোনো পুরস্কার পাবেন না? একথা-ই ইবনে জাওযী (৫১০-৫৭৯ হিজরী) ও আবদুল হক্ব দেহেলভী (৯৫৮-১০৫২ হিজরী) লেখেছেন।” [আবদুল হাই লাখনৌভী, ‘মজমু’আয়ে ফাতাওয়া’, ২:২৮২]

৫/ – রশীদ আহমদ লুধইয়ানভী (মৃত্যু: ১৩৪১ ‍হিজরী) লেখেন: “আবূ লাহাবের মতো দণ্ডিত অবিশ্বাসী যদি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর আশীর্বাদপূর্ণ বেলাদত/মীলাদ উপলক্ষে খুশি প্রকাশের কারণে কম শাস্তি পেতে পারে, তাহলে যে মুসলমান ওই উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করেন এবং (হুযূরের প্রতি) আপন মহব্বতের খাতিরে নিজ সম্পদ থেকে সামর্থ্যানুযায়ী ব্যয় করেন, তিনি কি কোনো পুরস্কার লাভ করবেন না?” [লুধইয়ানভী, ‘আহসান আল-ফাতাওয়া’, ১:৩৪৭-৩৪৮]

সুয়াইবিয়া’র মুক্তির এই ঘটনাটিকে দালিলিক প্রমাণ হিসেবে পেশ হতে এটা স্পষ্ট যে এই রওয়ায়াত/বর্ণনা সহীহ তথা নির্ভরযোগ্য বা বিশুদ্ধ। মওলিদুন্নবী (ﷺ)-এর বৈধতার পক্ষে এটা একটা (অকাট্য) প্রমাণ্য দলিল-ও বটে।

__________________

মওলিদুন্নবী (ﷺ)-এর উদযাপন ও অনুমতি (১ম খণ্ড)

মূল: শায়খুল ইসলাম ড: মুহাম্মদ তাহিরুল কাদেরী

অনুবাদ: কাজী সাইফুদ্দীন হোসেন

 🌍 ইসলামী বিশ্বকোষ এপ্স।

https://play.google.com/store/apps/details?id=com.islamboi.rizwan]


Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন