সুস্বাদু ফালুদা


       আমীরুল মুমিনীন হযরত শেরে খােদা আলী  رضى الله تعالى عنه  এর বরকতময় খিদমতে একবার সুস্বাদু ফালুদা পেশ করা হলে বললেন: “এটার সুগন্ধ, রং ও স্বাদ কতইনা উত্তম?” এটা আমি পছন্দ করি না যে, নিজের নফসকে এমন বস্তুর অভ্যস্ত করব, যার অভ্যাস তার নেই। (হিলইয়াতুল আওলিয়া, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ১২৩, হাদীস নং- ২৪৭)



       আল্লাহ তাআলার রহমত তাঁদের উপর বর্ষিত হােক এবং তাঁদের সদকায় আমাদের ক্ষমা হােক। 

নেয়ামত যেমন হিসাবও তেমনঃ


       প্রিয় ইসলামী ভাইয়েরা! আমীরুল মুমিনীন হযরত শেরে খােদা আলী  رضى الله تعالى عنه  এর নফস দমনের সাধনাকে মারহাবা! আহ্! যদি এমন হত! আমরাও প্রচন্ড গরমে নফসের দাবীতে আইচক্রীম কিংবা ফালুদা খাওয়ার সময় ও ঠান্ডা পানীয় পান করার সময় আমীরুল মুমিনীন হযরত শেরে খােদা আলী  رضى الله تعالى عنه  এর এ ঈমান তাজাকারী ঘটনাকে কখনাে কখনাে স্মরণ করে নিতাম। মনে রাখবেন! নফসকে যতটুকু আরাম আয়েশে অভ্যস্ত করা হয় সেটা ততটুকু দুষ্ট ও আরাম প্রিয় হয়ে যায়। দেখুন! যখন ফ্যান আবিস্কার হয়নি, তখনও মানুষ জীবন চালিয়ে যেত আর এখন অনেকের এয়ার কন্ডিশন রুমে শােয়ার অভ্যাস হয়ে গেছে। তাদের এখন গরমে এসি ছাড়া ঘুম আসতে কষ্ট হয়। এভাবে যে উত্তম ও সুস্বাদু এবং গরম গরম খাবার খেতে অভ্যস্ত, সাধারণ খাবার দেখে তাদের “মুড অফ” (মন খারাপ হয়ে যায়। বরং হঠাৎ কখনও কোন সময় ঘরে তাদের ইচ্ছার বিপরীত খাবার দেয়া হলে বকবক করে, ঝগড়া-বিবাদ করে, স্ত্রীর সাথে এমনকি নিজের মায়ের সাথে পর্যন্ত ঝগড়ায় লিপ্ত হয়ে যায় আর এভাবে মনে কষ্ট দেয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকারের কবীরা গুনাহ করে বসে। যদি আপনি কখনাে এ ধরণের ভুল করে থাকেন তবে আমার পরামর্শ হচ্ছে, তাওবা করে নিন এবং যার যার মনে কষ্ট দিয়েছেন তার থেকে ক্ষমাও চেয়ে নিন।



রাসুলুল্লাহ্ ﷺ ইরশাদ করেছেন: “যে ব্যক্তি কিতাবে আমার উপর দরূদ শরীফ লিখে, যতক্ষণ পর্যন্ত আমার নাম তাতে থাকবে, ফিরিশতারা তার জন্য ক্ষমা চাইতে থাকবে।” (তাবারানী)



অন্যথায় আল্লাহ্ অসন্তুষ্ট হলে মৃত্যুর পর খুবই আফসােস করতে হবে। মনে রাখবেন! দুনিয়ায় নেয়ামত যত উত্তম হবে কিয়ামতের দিন সেটার হিসাবও তত বেশি হবে। আখিরাতের হিসাবের ব্যাপারে উত্তমের হিসাব নিজ নিজ পছন্দের নিরিখে হবে। যেমন- যে ভাতের পরিবর্তে রুটি বেশি পছন্দ করে তার জন্য ভাতের বিপরীতে রুটি বড় নেয়ামত, আর সেহিসাবে তার থেকে রুটির হিসাব বেশি হবে আর যে ভাত বেশি পছন্দ হবে তার জন্য রুটির পরিবর্তে ভাতের হিসাব অধিক হবে। وَعَلىٰ هٰذَا القِيَاس (অর্থাৎ- আর এটা দিয়ে প্রতিটি বস্তুকে অনুমান করে নিন) আল্লাহ্ তাআলা ইরশাদ করেন:



ثُمَّ لَتُسۡـَٔلُنَّ یَوۡمَئِذٍ عَنِ النَّعِیۡمِ ﴿۸﴾


    কানযুল ঈমান থেকে অনুবাদ: অতঃপর নিশ্চয় অবশ্যই সেদিন তােমাদেরকে নেয়ামত সমূহের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে। (পারা- ৩০, সূরা তাকাসুর, আয়াত- ৮)

নেয়ামতের প্রকারভেদ ও সেগুলাের ব্যাপারে কিয়ামতে জিজ্ঞাসাবাদঃ



       প্রসিদ্ধ মুফাসসির হাকীমুল উম্মত হযরত মুফতী আহমদ ইয়ার খান  رحمة اللّٰه تعالىٰ عليه  এ আয়াতে মােবারকার ভিত্তিতে এটাও বলেন: এ জিজ্ঞাসা প্রতিটি নেয়ামতের ব্যাপারে হবে। শারীরিক বা মানসিক, প্রয়ােজনের হােক বা আরাম আয়েশের, ঠান্ডা পানি, গাছের ছায়া, এমনকি আরামের ঘুমেরও। যেমনটা হাদীস শরীফে রয়েছে এবং (نعيم) শব্দের ব্যবহার থেকেও জানা যায়। কোন অধিকার ছাড়া যা দান করা হয় তা হল “নেয়ামত”। আল্লাহ্ তাআলার প্রতিটি দান হচ্ছে নেয়ামত, চাই সেটা শারীরিক হােক কিংবা মানসিক। এটা দু’প্রকার (১) কসবী (২) ওয়াহবী। যে নেয়ামত আমাদের উপার্জনের দ্বারা লাভ হয় তা কাসবী। যেমন সম্পদ, ক্ষমতা ইত্যাদি। যা শুধুমাত্র আল্লাহ্ তাআলার দানে হয় তা ওয়াহবী। যেমন- আমাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, চন্দ্র, সূর্য ইত্যাদি।



কাসবী নেয়ামতের ব্যাপারে তিনটি প্রশ্ন করা হবেঃ



(১) কোথা হতে অর্জন করেছ?


(২) কোথায় খরচ করেছ?


(৩) এটার কৃতজ্ঞতায় কি করেছ?আল্লাহ্ প্রদত্ত নেয়ামত সম্পর্কে শেষের দুটো প্রশ্ন করা হবে।  (নুরুল ইরফান, ৯৫৬ পৃষ্ঠা)



      লাজ রাখলে গুনাহ গারুকি


      নাম রহমান হে তেরা ইয়া রব!


      আয়ব মেরে না খুল্ মাহশার মে


      নাম সাত্তার হে তেরা ইয়া রব!


      বে সবব বখশ্দে না পুছ আমল


      নাম গাফ্ফার হে তেরা ইয়া রব!

"মুবাহ" কখন ইবাদতে পরিণত হয়?



প্রিয় ইসলামী ভাইয়েরা! মুবাহ্ (অর্থাৎ- এমন আমল যাতে সাওয়াব হয় না, গুনাহ্ও হয়না) কাজের সাথে যদি ভাল নিয়্যত মিলানো হয় তবে তা সাওয়াবের কাজ হয়ে যায়। এখন ভাল নিয়্যত যত বেশি হবে সাওয়াবও তত বেশি সংযোজন হতে থাকবে। কিন্তু ঐ ভাল নিয়্যতের সম্পর্ক আখিরাতের আমলের সাথে হওয়া জরুরী। ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ “আল আশবাহু ওয়ান নাযায়ির”-এ রয়েছে, “মুবাহের সমূহের ব্যাপার নিয়্যতের ভিত্তিতে বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। যদি এগুলো দ্বারা ইবাদতে শক্তি অর্জন করা বা তা পর্যন্ত পৌঁছা উদ্দেশ্য হয় তবে তা (মুবাহ্ও) হল ইবাদত। (আল আশবাহু ওয়ান নাযায়ির, ১ম খন্ড, ২৮ পৃষ্ঠা, বাবুল মদীনা, করচী)



আনন্দের জন্য মুবাহের ব্যবহার



চেষ্টা করা উচিত যে, যে সকল মুবাহ কাজ করা হয় বা মুবাহ খানা খাওয়া হয় তাতে অধিকতর ভাল ভাল নিয়্যত মিলিয়ে নেয়া, যাতে বেশি পরিমাণে সাওয়াব লাভ হয়। যদিও ভাল নিয়্যত ছাড়া শুধুমাত্র আমোদ প্রমোদের জন্য মুবাহ্ বস্তু ব্যবহারকারী গুনাহগার নয় তবুও হুজ্জাতুল ইসলাম হযরত সায়্যিদুনা ইমাম মুহাম্মদ গাযালী (رضي الله عنه) বলেছেন: “তাকে অবশ্যই প্রশ্ন করা হবে আর যার সাথে হিসাবে ঝগড়া বিবাদ হয়েছে তাকে শাস্তি দেয়া হয়েছে। যে মানুষ দুনিয়াতে মুবাহ বস্তুসমূহ ব্যবহার করে যদিও তাকে কিয়ামতে আযাব হবে না কিন্তু ততটুকু পরিমাণ নেয়ামত আখিরাতে কমে যাবে।



ভেবেতো দেখুন! কত বড় ক্ষতিকর বিষয় যে, মানুষ ধ্বংসশীল নেয়ামতসমূহ অর্জনের জন্য খুব তাড়াতাড়ি করে আর তার পরিবর্তে পরকালীন নেয়ামতসমূহ কমানোর মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্থ হয়।” (ইহইয়াউল উলূম, ৫ম খন্ড, ৯৮ পৃষ্ঠা)



পরকালে শতভাগ কমতি



পিজা, পরটা, কাবাব, চমুচা, গরম গরম পিঁয়াজু-বেগুনী, আইসক্রীম, ঠান্ডা পানীয়, মজাদার ফালুদা, মিষ্টি মধুর শরবত ইত্যাদি উন্নত খাবারের সৌখিন প্রিয় ব্যক্তিরা। এছাড়া আলিশান কুঠির, বড় দালান, নিত্য নতুন দামী পোষাক, সব ধরণের আরাম-আয়েশীরা, ধনীরা, পুঁজিপতিরা, দুনিয়ায় প্রচুর আনন্দ উপভোগকারীরা, সুস্বাস্থ্যের অধিকারীরা, ক্ষমতার কামনা-বাসনায় লিপ্ত ব্যক্তিদের জন্য বিশেষভাবে চিন্তা-ভাবনা করার বিষয়, হায়! হায়! হায়! “তাযকিরাতুল আওলিয়া” নামক গ্রন্থে হযরত সায়্যিদুনা ফুযাইল বিন আয়ায (رضي الله عنه) বলেন: যখন দুনিয়াতে কাউকে নেয়ামত দান করা হয় তখন আখিরাতে সেটার শতভাগ কম করে দেয়া হয়। কেননা সেখানেতো শুধু তাই লাভ হবে যা দুনিয়াতে আয় করেছে। সুতরাং মানুষের ইচ্ছাধীন যে, আখিরাতে (তার) অংশ কম করবে নাকি বৃদ্ধি করবে। আরো বলেন: দুনিয়াতে উত্তম পোষাক ও ভাল খাওয়ার অভ্যাস করো না, কারণ হাশরে এসব বস্তু থেকে বঞ্চিত করা হবে। (তাযকিরাতুল আওলিয়া, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ১৭৫)



সদকা পিয়ারে কি হায়া কা


কেহ না লে মুঝ ছে হিসাব


বখ্শ বে পুছে লাজায়ে


কো লাজানা কিয়া হে।


প্রিয় ইসলামী ভাইয়েরা! দুনিয়ার সমস্ত মজা অবশেষে নিঃশেষ হয়ে যাবে। হায় যদি এমন হত! যদি মৃত্যুর আগে আগে আমাদের লোভ-লালসা নিঃশেষ হয়ে যেত। হায়! হায়! দুনিয়ার তামাশা আর এ বেওফা দুনিয়ার প্রতি আসক্তদের অন্ধকার জীবন! আমি আপনাদেরকে একটি শিক্ষণীয় ঘটনা শুনাচ্ছি, কেউ আছেন কি শিক্ষাগ্রহণকারী!

_______________

কিতাব : ফয়যানে সুন্নাত

লেখক : আমীরে আহলে সুন্নাত মাওলানা মুহাম্মদ বিলাল মুহাম্মদ ইলইয়াস আত্তার কাদেরী রযবীয়া (দা.)

সূত্রঃ 🌍 ইসলামী বিশ্বকোষ এপ্স।

https://play.google.com/store/apps/details?id=com.islamboi.rizwan


Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন