শরীয়তের বিধি-বিধান নবীর হাতে
আল-কুরআন ও তফসীরের আলোকেঃ
◼ মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন ,
يٰا أَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا أَطِيعُوا اللهَ وَأَطِيْعُوا الرَّسُوْلَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُم
তরজমায়ে কানযুল ঈমান : হে ঈমানদারগণ, নির্দেশ মান্য করাে আল্লাহর এবং নির্দেশ মান্য করাে রসূলের এবং তাদেরই, যারা তােমাদের মধ্যে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। (সূরা নিসা, আয়াত - ৫৯)
উক্ত আয়াতে কারীমার আলােকে প্রতীয়মান হয় যে, মুমিন বান্দা মাত্রই আল্লাহ ও তাঁর রসূল (ﷺ) ও উলিল আমরের হুকুম তথা বিধানমালা মান্য করতে বাধ্য। কেননা আল্লাহ পাক সেটা বান্দার উপর ওয়াজিব বা আবশ্যকীয় করেছেন। প্রকৃতপক্ষে সৃষ্টিকর্তার এ বসুন্ধরায় প্রভাকর যতদিন প্রখর আলাে ছড়াবে, মৃগাস্ক জ্যোৎস্নানাে কিত করবে, গাগনাম্বু অবারিত বর্ষিত হবে, আর মহাপ্রলয় পরবর্তী শেষ বিচারের দিন মনুষ্য ও জিন জাতির হিসাব নিকাশ সমাপ্তিতে স্বর্গ ও নরকবাসী চিহ্নিত করা হবে, তাও হাবীবুল্লাহ (ﷺ)'র বিধিবিধানানুযায়ী করা হবে। আল্লাহ পাক স্বয়ং সে অধিকার দান করেছেন, গ্রহীতা স্বয়ং গ্রহণ পূর্বক বাস্তবায়ন করেছেন, মহামান্য মানীষীগণ যা স্বীকার ও শিরােধার্য করে নিয়েছেন, বিদগ্ধ লেখকবৃন্দ যা স্বীয় কিতাবের পরতে পরতে লিপিবদ্ধ করেছেন তাকে কুফরি বা শিরক প্রমাণের অপচেষ্টা করা - এ কেমন ধার্মিকতা ! অথচ এ সত্য সৃষ্টির সূচনালগ্ন হতেই প্রতিষ্ঠিত, তাইতাে আল্লাহর প্রেরিত নবী - রসূলগণ আলাইহিমুস সালাতু ওয়াস সালাম এ বিধিবিধানের উপর ঈর্ষা করেছিল, মহান রবের দরবারে তাবেদারী করার আকুতি জানিয়েছিল আর আল্লাহ পাক তা কবুল করেছিল।
অতএব সুপ্রতিষ্ঠিত একটি বিষয়কে নব্য আঙ্গিকে তক-বির্তকের মাধ্যম বানানাে সমপূর্ণ অজ্ঞতার পরিচায়ক, বৈ আর কিছুই নয়। যেখানে আল্লাহর নবীকে (ﷺ) নিঃসন্দেহে তিনি শরয়ী বিধানমালার ইখতিয়ার দান করেছেন, সেখানে উম্মত কতৃক হস্তক্ষেপ পূর্বক আপনা নবীর (ﷺ)’র শ্রেষ্ঠত্ব ও মান মর্যাদা হ্রাস করার অপচেষ্টা করাটা কিরূপ ঔদ্ধত্যতা, তা ব্যক্ত করার ভাষা খুজেঁ পাই না।
সুবিদিত এ বিষয়টিকে যুগে যুগে মানুষের নিকট উপস্থাপন করেছেন ফুকাহায়ে ইজাম, মুহাদ্দিস, মুফাসিসর, মুয়াররীহিন ও উলামায়ে আহলে হক। অগ্রবর্তীদের সে সত্য দাবীর স্বপক্ষে সুদৃঢ় দলীল-প্রমাণ পেশ করে সংক্ষিপ্ত তবে পূর্ণাঙ্গ পুস্তক প্রণয়ন করেছেন হিজরী চর্তুদশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ, কলম যুদ্ধের বিজেতা সৈনিক, শায়খুল মুহাদ্দিসীন, সাইয়িদুল মুহাকীনি, সাইয়িদী ওয়া সানাদী, আ'লা হযরত ইমাম আব্দুল মুস্তফা আহমদ রেযা খান রহমাতুল্লাহি তাআলা আলাইহি, পুস্তকের নাম “মুনিয়াতুল - লবীব আন্নাত - তাশরিয়ী বিইয়াদিল হাবীব” । এ পুস্তকে বিশুদ্ধ হাদিসসমূহের নিরিখে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, নিঃসন্দেহে শরীয়তের বিধিবিধান আল্লাহর প্রিয় হাবীবের (ﷺ)র হতে ন্যস্ত। যেখানে গ্রন্থকার বপ্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন যে, আল্লাহর নবী ইবরাহীম খলীলুল্লাহ (عليه السلام) যেমনি মক্কা শরীফিকে হারাম ও বরকতের জন্য দোয়া করেছেন, তেমনি আল্লাহর নবী হাবীবুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহিস সালাম মদীনা শরীফকে হারাম বানিয়েছেন ও তার বরকতের জন্য দোয়া করেছেন।
এ বিষয়ের সমপৃক্ততায় কুরআন-সুন্নাহর কতিপয় ইশারা প্রমাণাসিদ্ধ:
◼ তাফসীরে জালালাইনে পবিত্র কুরআনের সূরা নিসার ৫৯ নম্বার আয়াতের ব্যাখ্যায় বর্ণিত রয়েছেঃ
ونزل لمَّا اختصم يهودى ومنا فق فد عا المنا فق الى كعب بن الا شر ف ليحكم بينهما ودعا اليهو دى الى النّبىّ صلى الله تعالى عليه وسلم فا تياه فقضى لليهودى فلم يرضى المنا فق واتيا عمر رضى الله عنه فذ كرله اليهودى ذلك فقال للمنا فق اكذ لك قال نعم فقتله
অর্থাৎ আয়াতটি তখন অবতীর্ণ হয়, যখন জৈনিক ইহুদি ও মুনাফিকের মাঝে কোনাে বিষয়কে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়ে যায়, ফলে মুনাফিক ব্যক্তিটি ইচ্ছে করল বিষয়টি কা'ব ইবনে আশরাকের কাছে উস্থাপন করতে, যাতে সে উভয়ের মাঝে পয়সালা করে দিতে পারে। আর ইহুদি ব্যক্তি বিষয়টি নবী করীম (ﷺ)-এর দরবারে উস্থাপন করতে চাইলেন। অবশেষে তারা উভয়ে বিষয়টি নিয়ে হুজুরে পাক (ﷺ)-এর দরবারে উপস্থিত হলেন, রাসূল (ﷺ) ইহুদির পক্ষে রায় দিলেন। তবে মুনাফিক ব্যক্তি এ রায়ে সন্তুষ্ট হতে পারল না, তাই তারা দ্বিতীয়বার ফয়সালার জন্য হযরত ওমর (رضي الله عنه) - এর নিকট উপস্থিত হল। আর ইহুদি ব্যক্তি হযরত ওমর (رضي الله عنه) - এর নিকট রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর কৃত বিচার মীমাংসার কথাটি পরিস্কার জানিয়ে দিলেন, হযরত ওমর (رضي الله عنه) মুনাফিক ব্যক্তিকে বলেলন ব্যাপারটা কী তাই? মুনাফিক বলল, হ্যা। তা শুনে হযরত ওমর (رضي الله عنه) তাকে হত্যা করে ফেললেন।
এতে প্রতীয়মান হয় যে, যে কেউ রাসূলুল্লাহর (ﷺ)- এর বিধান অমান্য করে, ফারুকে আজম (رضي الله عنه)'র মতে তার শাস্তি মৃত্যুদন্ড ।
◼ ইমাম আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে জারীর আত-তাবারি (رحمة الله) সূরা মায়িদার ৪২ নং আয়ারেতর তাফসিরে লেখেন –
(وان تعرض عنهم) أى من الحلم بينهم (فلن يضروك شيئً) أى لايقدرون لك على ضرر فى دين او نيا خدع النظر بينهم أن شئت(وان حكمت) أى وان اخترت أن تحكم (فاحكم بينهم بالقسط) أى العدل وقيل بما فنى القران وشريعة الاسلام_
ইমাম তাবারী (رضي الله عنه) বলেন, হে নবী! ব্যভিচারকারী স্ত্রীলােকটির গােত্রের লােকেরা যারা এখনও পর্যন্ত আপনার কাছে আসেনি, যদি তারা আপনার কাছে অভিযােগ নিয়ে উপস্থিত হয়, তবে আপনি ইচ্ছা করলে তাদের মাঝে ফয়সালা করতে পারেন। আর ইচ্ছা করলে আপনি তাদেরকে উপেক্ষাও করতে পারেন, ফলে বিচার ভার তাদের প্রতিই অপিৰ্ত হবে। অতএব আপনার اختيار আছে এ দুয়ের যে কোনটি অবলম্বন করতে পারেন।
(জামেউল বয়ান ফি তাফসিরুল কুরআন, ৩য় খন্ড, পৃ. ৩০৪)
উপযুক্ত আলােচনায় বুঝা গেল যে, শরয়ী বিধিবিধানের ইখতিয়ার। আল্লাহ তাঁর রাসূলকে (ﷺ)কে দান করেছেন।
◼ আল্লামা কাযী মুহাম্মদ ছানাউল্লাহ পানিপথী (রহঃ) তাঁর তাফসীরে মাযহারী শরীফে সূরা আহযাবের ৩৬ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন –
وما كان لمؤ من ولا مؤ منة
মুমিন পুরুষ কিংবা মুমিন নারীর থাকবে না।
অর্থাৎ আব্দুল্লাহ ইবনে জাহশ ও যয়নব বিনতে জাহশের জন্য জায়েয নয়-
اذا قض الله ورسوله امرًا
আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ) কোন বিষয়ে নির্দেশ করলে : অর্থাৎ কোন বিষয়ে চূড়ান্ত নির্দেশ দিলে।
ان يكون لهم الخيرة من امرهم
সে বিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার:
অর্থাৎ সে বিষয়ে নিজেদের ইচ্ছা মত কোন সিদ্ধান্ত নেয়া তাদের জন্য বৈধ নয়, বরং নিজেদের ইচ্ছাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (ﷺ)’ ইচ্ছার অনুবর্তী বানাতে হবে। তিনি বলেন, আলােচ আয়াতটি প্রমাণ করে যে, শর্তহীন আদেশ দ্বারা ওয়াজিব (ফরয) বা অবশ্য পালনীয় বিধান সাব্যস্ত হয়।
[তাফসিরে মাযহারী, দশম খন্ড, পৃ, ৪১]
◼ তাফসীরে জালালাইন শরীফে রয়েছে,
وما ارسلنا من رسول الا ليطاع فيما يأمر به ويحكم بإذن الله با مره لا يعص ويخا لفُ _
অর্থাৎ আমি কেবল এই উদ্দেশ্যেই রাসূল (ﷺ)’ প্রেরণ করেছি, যেন আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী নির্দেশ ও ফয়সালা মান্য করা হয়, তাদের নাফরমানি ও বিরুদ্ধাচারণ যেন না করা হয়।
[তাফসিরে জালালাইন, প্রথম খন্ড]
আর উপরােক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায়ঃ
◼ আল্লামা কাযী মুহাম্মদ সানাউল্লাহ পানিপথী (রহঃ) বলেন –
“রিসালতের উদ্দেশ্যই হচ্ছে পায়গাম্বারের আনুগত্য মানুষের উপর অপরিহার্য করা । ازن অর্থ নির্দেশ, অর্থাৎ আল্লাহর নির্দেশ হচ্ছে, যে পয়গম্বর প্রেরিত হবে, মানুষ তাঁর নির্দেশ পালন করবে, আর যে ব্যক্তি তার রায়ে সন্তুষ্ট না হবে এবং তাঁর নির্দেশ অমান্য করবে, সে হত্যার উপযুক্ত হবে। কেননা আল্লাহর রাসূলের (ﷺ) বিচার না মানার অর্থই হচ্ছে তাঁর রিসালত কবুল না করা।
['তাফসিরে মাযহারী, ৩য় খন্ড]
◼ আল্লামা আবুল ফিদা ইবনে কাসীর (রহঃ) সূরা নিসার ৬৫ নং আয়াতের তাফসীরে বলেন, আল্লাহ তাআলা স্বীয় পবিত্র ও সম্মানিত সত্তার শপথ করে বলেছেন, কোন ব্যক্তিই ঈমানের সীমার মধ্যে আসতে পারে না যে পর্যন্ত সমস্ত বিষয়ে আল্লাহ তাআলার শেষনবী (ﷺ)'কে ন্যায় বিচারক মেনে না নেবে এবং প্রত্যেক র্নিদেশকে, প্রত্যেক মীমাংসাকে, প্রত্যেক সুন্নাতকে প্রত্যেক হাদিসকে গ্রহণযােগ্য রূপে স্বীকার না করবে। আর অন্তর ও দেহকে একমাত্র ঐ রাসূলেরই (ﷺ) অনুগত না করবে। মােটকথা, যে ব্যক্তি তার প্রকাশ্য, গােপনীয়, ছােট ও বড় প্রতিটি বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) - এর বিধিবিধানকে সমস্ত নীতির মূল মনে করবে সে হচ্ছে মুমিন।
['তাফসিরে ইবনে কাসির, প্রথম খন্ড]
____________________
কিতাবঃ শরীয়তের বিধি-বিধান নবীর হাতে
মূলঃ আ'লা হযরত মুজাদ্দিদ ইমাম আহমদ রেযা (রহঃ)
অনুবাদঃ মুহাম্মদ হােসাইন রেযা কাদেরী।
সূত্রঃ 🌍 ইসলামী বিশ্বকোষ এপ্স।
https://play.google.com/store/apps/details?id=com.islamboi.rizwan
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন